প্রশিকা ভবন বুঝিয়ে দেয়ার বিষয়ে আদালতের আদেশ অমান্য করায় সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান ড. কাজী ফারুক আহমদকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অফিসের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আদালতে (হলফনামা আকারে) এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
প্রশিকার বর্তমান চেয়ারম্যান ও সিইও’র আইনজীবী সুলায়মান সাংবাদিকদের এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, আদালত অবমানার বিষয়ে করা আবেদন শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার হাইকোর্টের একক বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে আজ প্রশিকার বর্তমান চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এমএ ওয়াদুদ ও সিইও মো. সিরাজুল ইসলামের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. সোলায়মান। অন্যদিকে প্রশিকার সাবেক চেয়ারম্যান কাজী ফারুকের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম (অ্যাটর্নি জেনারেল), জেড আই খান পান্না, মাহাবুব আলী এবং এএম আমিন উদ্দীন প্রমুখ।
আইনজীবী সুলায়মান জানান, আদালতের নির্দেশ না মানায় বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) প্রশিকার সাবেক চেয়ারম্যান ড. কাজী ফারুককে এক মাসের দেওয়ানি কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে হলফনামার মাধ্যমে তাকে অফিস বুঝিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অফিস বুঝিয়ে না দিলে তাকে গ্রেফতারের নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত।
এর আগে ২০০৯ সালে ২৪ মে বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশিকার তৎকালীন চেয়ারম্যান কাজী ফারুককে অপসারণ করা হলে তিনি বিচারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন এবং অপসারণ আদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদন করেন। কিন্তু তার ওই আবেদন আদালত খারিজ করে দেন। ওই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে তিনি (বিচারিক) জজ আদালতে আপিল করেন। কিন্তু সেই আবেদন খারিজ হওয়ায় তিনি হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন।
সেই রিভিশন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট কাজী ফারুককে প্রশিকার বর্তমান চেয়ারম্যান ও গভর্নিং বডির কাছে অফিস বুঝিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা পালন না করে কাজী ফারুক ২০১২ সালে সন্ত্রাসীদের নিয়ে অফিসে হামলা চালায় এবং দখল করে রাখে। পরে এ বিষয়ে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে হাইকোর্টকে অবহিত করা হলে আদালত রুল জারি করেন।
ওই রুলে কাজী ফারুককে কেন দেওয়ানি কারাগারে আটক রাখা হবে না এবং কেন তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত। সেই রুলের শুনানি শেষে মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন বলে জানান আইনজীবী মো. সোলায়মান।
প্রসঙ্গত, প্রশিক্ষণ, শিক্ষণ ও কাজ— তিনটি শব্দের আদ্যাক্ষর নিয়ে ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র। পরের বছর ঢাকা ও কুমিল্লার কয়েকটি গ্রামে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। পর্যায়ক্রমে তা সারা দেশে বিস্তৃত হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, অনিয়ম, মামলা, কার্যালয় দখল ও পাল্টা দখলের মতো ঘটনায় বর্তমানে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষ এ এনজিওর ভবিষ্যৎ। দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে এর কার্যক্রম।
জানা যায় দেশজুড়ে প্রশিকার ২২১টি শাখা অফিসের মধ্যে বর্তমানে ১১৫টিই বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলোর অবস্থাও দুর্বল। কর্মী সংখ্যাও ১২ হাজার থেকে বর্তমানে ৩ হাজারে নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে শাখা কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা। এর মধ্যে প্রায় ৫০টি শাখা অফিস প্রদান করা ঋণের সুদ থেকে কর্মীদের বেতন সমন্বয় করে নেয়।
এ ছাড়া সার্বজনীন শিক্ষা কর্মসূচি প্রকল্পের ৭০০ স্কুল এবং টিস্যু কালচার, প্রশিকা ফ্যাব্রিকস ও প্রশিকা কম্পিউটার সেন্টারসহ ৩৫টি কর্মসূচির ২০টি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আদায় হচ্ছে না মাঠ পর্যায়ে বিতরণকৃত ঋণের ২ হাজার কোটি টাকা।
মূলত দেড় দশক আগে থেকেই প্রশিকায় সঙ্কটের সূত্রপাত হয়। ২০০১ সালের শুরুর দিকে সংস্থাটির নামে ৩২০ কোটি টাকার একটি বিদেশি অনুদান ব্যাংকে জমা হয়। কিন্তু তৎকালীন জোট সরকার এটি ছাড় করতে সম্মত হয়নি। এ অর্থ ফেরত যাওয়ার পর থেকে আর কোনো সরকারি বা বিদেশি অনুদান পায়নি প্রশিকা। এতে প্রকট হতে থাকে সংস্থাটির অর্থ সঙ্কট।
পামাপাশি সাবেক চেয়ারম্যান ড. কাজী ফারুকের ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন প্রশিকার সঙ্কট ঘনীভূত করে। পরবর্তীতে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে প্রশিকার ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ। শুরু হয় পরস্পরকে দোষারোপ। রাজনৈতিক দল গঠন নিয়ে কাজী ফারুকের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দূরত্ব তৈরি হয়। তারা কাজী ফারুককে প্রশিকার শীর্ষ পদ থেকে বরখাস্ত করে নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচন করেন।
কিন্তু এ সিদ্ধান্তকে অনৈতিক দাবি করে কাজী ফারুক আদালতের আশ্রয় নেন। সমর্থকদের নিয়ে একটি বার্ষিক সাধারণ সভা করে কাজী ফারুক নিজে চেয়ারম্যান এবং অনুসারীদের বিভিন্ন পদ দেন। ১৪ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর প্রশিকার বিবদমান দুই পক্ষই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের পক্ষে সমর্থন আদায়ে তদবির করতে থাকে। এর মধ্যেই চলতে থাকে প্রশিকায় একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় দুই পক্ষের মহড়া।
এফএইচ/এসএইচএস/এমএমজেড/আরআইপি