দেশজুড়ে

লিটনের সামনে পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জ

পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়েই শপথ নিলেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) নবনির্বাচিত মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শপথ নেন তিনি। বৃহস্পতিবার লিটন মেয়রের চেয়ারে বসবেন। এবার নগরবাসীকে ৮২টি প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাসিক মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য খায়রুজ্জামান লিটন। সাবেক মেয়র ও নগর বিএনপির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন তিনি। এর আগে ২০০৮ সালে মেয়র নির্বাচিত হন লিটন। সেবার ব্যাপক উন্নয়ন করে নগরীর চেহারা পাল্টে দেন। তবে নানান কারণে ২০১৩ সালের নির্বাচনে বুলবুলের কাছেই ধরাশয়ী হন তিনি। মনে করা হয়, উন্নয়ন ব্যর্থতাই এবার বুলবুলের ভরাডুবির কারণ। আর রাজশাহী বদলে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনরায় নিজের পক্ষে নিয়েছেন লিটন। কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার পর লিটনের সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই তার জন্য হয়ে উঠতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ। নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি লিটনের সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়র হিসেবে লিটনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান। এবারের নির্বাচনী ইশতারে নগরবাসীর কর্মসংস্থানে জোর দিয়েছেন লিটন। বিশেষ করে গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে গার্মেন্ট শিল্প স্থাপন, বিশেষ অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা এবং বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক দ্রুত বাস্তবায়ন করে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। তাছাড়া রেশম কারখানা ও টেক্সটাইল মিল পুরোদমে চালু, রাজশাহী জুটমিল সংস্কার, কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন এবং কুটির শিল্পের সম্প্রসারণের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তবে এ সবকিছুই নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের ওপর। এখানে মেয়র হিসেবে লিটন কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবেন সেটিই দেখার বিষয়। লিটনের সামনে রাজশাহীর উন্নয়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তিনি তার নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাধান্য দিয়েছেন এই ইস্যু। নগরীর চারদিকে রিং রোড ও লেক নির্মাণ, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ফ্লাইওভার এবং ওভারপাশ নির্মাণ, পর্যটনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও সাংষ্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এছাড়াও নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং মাতৃসদন স্থাপনের অঙ্গিকার করেছেন লিটন। রাজশাহী শিশু হাসপাতাল ও প্রস্তাবিত পানি শোধনাগার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নও করতে চান তিনি। বস্তিবাসীদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে চান। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষদের বসবাসের জন্য বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ি নির্মাণ করে সহজ কিস্তিতে মালিকানা দেয়ার। মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, আলেম ও সাংবাদিকদের জন্য আলাদা আবাসন এলাকাও গড়ে তুলতে চান তিনি। এখানেই শেষ নয়- শিক্ষানগরী খ্যাত রাজশাহীর শিক্ষাখাতের উন্নয়নে ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে লিটনের। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউটকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর, পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, নতুন একাধিক বালক ও বালিকা স্কুল-কলেজ নির্মাণ, পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীত, ইউনানী এবং আয়ুর্বেদিক মহাবিদ্যালয় স্থাপন ও বিশ্বের প্রধান প্রধান ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে চান। নগরীর যোগাযোগ ক্ষেত্রেও তার পরিকল্পনা গগণচুম্বি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাজশাহী-ঢাকা বিরতিহীন ট্রেন এবং রাজশাহী-কোলকাতা ট্রেন চালুর। রাজশাহী বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে চান তিনি। এছাড়া শুকিয়ে যাওয়া পদ্মায় ড্রেজিং করে নৌ-চলাচল এবং নতুন নতুন সড়ক নির্মাণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে তার। বিশ্লেষকরা বলছেন, লিটন তার যে উন্নয়ন মহাপরিকল্পনায় নিয়েছেন তাতে বিপুল পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে হাজার হাজার মানুষ গৃহচ্যুত হবে। কৃষিজমি হারিয়ে বেকার হতে হবে অনেককেই। এসব প্রকল্প বাস্তয়নে গড়ে উঠতে পারে ঠিকাদার সিন্ডিকেট। হতে পারে টেন্ডারবাজিও। লিটনের আগের মেয়াদে নেয়া বেশ কিছু পরিকল্পনা এভাবেই ভেস্তে যায়। যার ফলও উঠে আসে সেইবার ব্যালটে। সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, ২০১৩ সালে তৎকালীন মেয়র লিটনের পরাজয়ের প্রধান কারণই ছিলো তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব। কিন্তু এবার সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা তাকে জেতাতে মরিয়া হয়ে মাঠে ছিলেন। এর ফলও মিলেছে। তাদের ধারণা, এবারের ফলের কারণে মেয়রের চেয়ারে বসার পর লিটনের প্রতি নেতাকর্মীদের আবদার বাড়বে। এতে নগর ভবন হয়ে উঠতে পারে দলীয় কার্যালয়ের মতো। তার চারপাশে গড়ে উঠতে পারে সুবিধাবাদিকের দুষ্টুচক্র। তবে রাজশাহীর পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ খায়রুজ্জামান লিটন এবার সেই পথে হাঁটতে চান না। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি এগিয়ে যেতে চান। বলেন, তিনি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন যোগ্য। যেকোন মূল্যে নগরবাসীকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন তিনি। তিনি আরো বলেন, নগরভবন নাগরিক সেবার প্রতিষ্ঠান। নগরবাসীর জন্য নগরভবনের দরজা সবসময় খোলা। তিনি আওয়ামী লীগের নেতা হলেও নগরবাসীর মেয়র। তিনি নাগরিক হিসেবে সবাইকে সমান সুযোগ দিতে চান। নগরীর উন্নয়ন সঠিক পথে এগিয়ে নিতে সবার সর্বাত্মক সহায়তা চান তিনি। লিটন বলেন, বর্তমান সরকার উন্নয়নের সরকার। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তিনি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সেখানে রাজশাহীবাসীকে দেয়া নানান প্রতিশ্রুতির কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেনও। প্রধানমন্ত্রীও সকল ক্ষেত্রে রাজশাহীর উন্নয়নে সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। আগামী ৫ বছরে রাজশাহীকে এশিয়ার সেরা শহরে পরিণত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন লিটন। ফেরদৌস সিদ্দিকী/এফএ/আরআইপি