ভ্রমণ

জীবনে সতেজতা ফেরাতে চায়ের দেশে

অনিক আহমেদ

সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস অনুষদের ৩য় ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ভ্রমণের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠেছিলেন। এদিকে চলতি বছরের মার্চ থেকে করোনা সংকটে ক্যাম্পাস বন্ধ। দীর্ঘদিন প্রিয় ক্যাম্পাসকে ছেড়ে বন্ধু-বান্ধবহীন অবস্থায় একঘেয়ে হয়ে উঠি। তাই তো জীবনে সতেজতা ফেরাতে অক্টোবরের ১৯-২২ তারিখে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। সে অনুযায়ী আগেই অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটা হয়। ভ্রমণের আগের দিন সবাই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকা আসি।

নির্ধারিত দিনে রাত ৯টায় ঢাকা বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেসে চেপে বসি। যখন প্রথম দিনের গন্তব্য শ্রীমঙ্গল স্টেশনে নামি; তখন রাত ২টা। ৮ বন্ধু মিলে শ্রীমঙ্গলের এদিক-ওদিক ঘুরে, চা-বিস্কুট খেয়ে সময় কাটিয়ে দেই। স্টেশনে নেমেই একজন চালকের সাথে দর-কষাকষি করে ১৮০০ টাকায় সারাদিনের জন্য চাঁদের গাড়ি ভাড়া করি।

প্রথমদিনের পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল হামহাম জলপ্রপাত। সঙ্গে মাধবপুর লেক, লালটিলা, নুরজাহান টি-স্টেট এবং লাউয়াছড়া উদ্যান। সারাদিনের ভ্রমণক্লান্তির কথা চিন্তা করে খুব সকালে শ্রীমঙ্গলের বিখ্যাত পানসী রেস্টুরেন্ট থেকে নাস্তা করে হামহামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। মাঝপথে গাইড নেই।

যাত্রার শুরুতেই দু’পাশের আঁকাবাঁকা রাস্তা আর অপরূপ সুন্দর চা বাগান সবাইকে মুগ্ধ করে। কিছুক্ষণ পর লাউয়াছড়া উদ্যানের মূল ফটকে এসে জানতে পারি, করোনার কারণে এটি বন্ধ। কিছুটা হতাশ হয়ে আবার চলতে থাকি। দেড় ঘণ্টা পর কলাবনপাড়া পৌঁছাই। এখান থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা পাহাড়ি পথে ট্র্যাকিং শেষে দিনের প্রথম গ্রুপ হিসেবে হামহাম পৌঁছাই। তবে ট্র্যাকিংয়ে উঁচু-নিচু পথে জোঁকের কবলে পড়াসহ নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়।

গন্তব্যে পৌঁছে সবাই জলে ঝাঁপিয়ে ক্লান্তি নিবারণের চেষ্টা করি। সঙ্গে সমানতালে চলে ফটোশুট। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ফেরার যাত্রার শুরুতেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পাহাড়ি পথকে আরও প্রতিকূল করে তোলে। প্রচুর সাবধানতা অবলম্বন করে দুপুর একটায় পুনরায় কলাবনপাড়া পৌঁছাই। এ এলাকায় সাধারণত কোনো সিমেই নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না, যেটা সত্যিই ভোগান্তির।

এরপর প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত অবস্থায় মাধবপুর লেক, নুরহাজান টি-স্টেটের সৌন্দর্য উপভোগ করে দুপুরের খাবার সেরে নেই। শেষ বিকেলে দিনের শেষ স্পট লালটিলা দেখতে যাই। যদিও এখানে পর্যটক কম আসে। তবে জায়গাটির সৌন্দর্যের প্রচারণা হলে অচিরেই এটি জনপ্রিয় পর্যটন স্পট হতে পারে। সবকিছু ঘোরা শেষে সন্ধ্যায় পুনরায় শ্রীমঙ্গল ফিরে রাতের ট্রেনে দুই ঘণ্টা পর সিলেট পৌঁছাই। স্টেশনে নেমে প্রথমেই ঢাকা ফেরার ট্রেনের টিকিট কেটে রাতের খাবার সেরে হোটেল ভাড়া করে সবাই ঘুমিয়ে পড়ি।

সিলেটে বাকি দুই দিনের ট্যুর প্ল্যানে ছিল শাহজালাল ও শাহপরাণের মাজার, লালাখাল, জাফলং, আগুন পাহাড়, রাতারগুল, বিছনাকান্দি ও ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর। সে উদ্দেশে পরদিন সকালে ৪১০০ টাকায় দুই দিনের জন্য রিজার্ভ লেগুনা ভাড়া করি। এরপর পানসী রেস্টুরেন্ট থেকে সকালের খাবার সেরে শুরুতে শাহপরাণের মাজার দর্শন করে লালাখালের দিকে রওনা হই। ঘণ্টাখানেক পর লালাখাল পৌছে এক ঘণ্টার জন্য পাঁচশ টাকায় নৌকা ভাড়া করি। পরিষ্কার নীল পানির জন্য বিখ্যাত এ স্পটের সৌন্দর্য সবাইকেই বিমোহিত করে।

এরপর লেগুনায় জাফলং যাত্রা শুরু। দুপুরের একটু পরই পৌঁছে সেখানকার সৌন্দর্য দেখতে পাই। বর্ষাকাল না হওয়ায় পানি কম থাকলেও আশেপাশের দৃশ্য ছিল মোহনীয়। বিশাল পাহাড়ের কোলঘেঁষে সড়কে গাড়ি চলাচল, জাফলং ব্রিজ, বিশাল বিশাল পাথর দেখতে পর্যটকের কমতি ছিল না। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মোহনীয় এ জায়গায় দেড় ঘণ্টা ধরে গোসল, ফটোশুট, হৈ-হুল্লোড় করে বিকেলে ফেরার পথ ধরি। সন্ধ্যায় আগুন পাহাড়ে ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন জ্বালাই। রাতে পুনরায় সিলেট শহরে পৌঁছে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত অবস্থায় দুপুরের ও রাতের খাবার একসাথে খাই।

পরদিন ছিল আরও ব্যস্ততম দিন। তবে এদিন রওনা করতে দেরি করে ফেলি। তার ওপর দিনের প্রথম স্পট রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের পথের ভাঙা সড়ক বেশ ভোগান্তিতে ফেলে। সেখানে পৌঁছে নির্ধারিত ৭৫০ টাকা করে দুটি নৌকায় বনের ভেতরে ঢুকে পড়ি। বর্ষাকাল না হওয়ায় পানি কম থাকায় রাতারগুলের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারিনি।

ঘণ্টাখানেক ঘুরে দ্রুতই বিছনাকান্দির উদ্দেশে বের হই। তবে ঘাটে পৌঁছাতেই দুপুর হয়ে যায়। সেখান থেকে নৌকায় যাওয়া-আসায় আরও তিন ঘন্টা লাগবে। এতে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ‘নতুন’ জনপ্রিয় স্থান ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর মিস হয়ে যেত। এ ছাড়া বিছনাকান্দি ও জাফলংয়ের মাঝে অনেকটা মিল ছিল। তাই শেষমেষ বিছনাকান্দি বাতিল করে ভোলাগঞ্জ রওনা দেই।

ঘণ্টাখানেক পর ঘাটে পৌঁছে নির্ধারিত ৮০০ টাকায় যাওয়া-আসার নৌকায় যাত্রা শুরু করি। ২০ মিনিট পর সাদাপাথর অঞ্চলে পৌঁছে যাই। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা অপরূপ জায়গাটি দেখে সবার মন জুড়িয়ে যায়। চারপাশে বিশাল পাহাড়, মেঘালয়ের ছোট্ট ছোট্ট বাড়িগুলো দূর থেকে নজর কাড়ছিল।

এখানকার সাদাপাথরের বিশাল সমারোহ সবাইকে মুগ্ধ করে। সঙ্গে ছিল পানির বিশাল স্রোত, যেখানে হেঁটে একা পার হওয়া প্রায় অসম্ভব। আমরা ৮ জন একে অপরের হাত ধরে স্রোত পেরিয়ে বিস্তৃত পাথরের সৌন্দর্য অবলোকন করলাম। ভ্রমণের শেষদিন বিকেলে মনোমুগ্ধকর জায়গাটি দেখে বুঝতে পারলাম, কেন একে ‘বাংলার কাশ্মির’ বলা হয়। বিছনাকান্দি যেতে না পারার আফসোস সাদাপাথর ভ্রমণ অনেকটাই ঘুচিয়ে দিলো।

এরপর নৌকায় নদী পার হয়ে লেগুনায় উঠলাম। সন্ধ্যার পরপরই সিলেট শহরে শাহজালালের (রহ.) মাজার দেখে, কিছু কেনাকাটা করে, রাতের খাবার শেষ করলাম। রাত ১০টায় ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক আগেই স্টেশনে পৌঁছে বিশ্রাম নিতে থাকলাম। ট্রেন ছাড়ার পর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে এবারের মতো দুটি কুড়ি, একটি পাতার দেশ সিলেটকে বিদায় জানালাম।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।

এসইউ/এমকেএইচ