দেশজুড়ে

হবিগঞ্জ আদালতে বাড়ছে মামলার জট : দুর্ভোগে বিচারপ্রার্থীরা

হবিগঞ্জে আদালতে দিন দিন মামলার জট শুধু বাড়ছেই। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার পাহাড় জমছে। মামলা বৃদ্ধির তুলনায় নিষ্পত্তির সংখ্যা অত্যন্ত নগন্য। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী পয়লা মার্চ পর্যন্ত এ আদালতে মামলার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪৫২টি। যা একজন বিচারকের পক্ষে পরিচালনা করা অত্যন্ত দুষ্কর। প্রতিদিনের কার্যতালিকায় থাকা মামলাগুলোতে শুধু তারিখ দিলেও দিন শেষ হয়ে যায়। আর মামলা শুনতে গেলেতো কথাই নেই। ফলে বছরের পর বছর গড়িয়ে গেলেও উপযুক্ত বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা। অনুরুপ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে অন্য আদালতগুলোতেও। জুডিসিয়াল আদালতে মামলা রয়েছে ২০ হাজারের উপরে। প্রতিনিয়ত এখানে যে পরিমাণ মামলা দায়ের হয়, তা অন্যকোনো বড় জেলায়ও হয় কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সিনিয়র আইনজীবীরা।আদালত সূত্রে জানা যায়, হবিগঞ্জে জুডিসিয়াল বিভাগে বিচারক হিসেবে ৯ জনের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ৮ জন। এখানে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদটি খালি রয়েছে। এ বিভাগে পয়লা মার্চ পর্যন্ত মামলা ছিল ২০ হাজার ২৭টি। ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন দায়ের হয়েছে ৫১২টি। এ অবস্থায় একেকটি আদালতে গড়ে মামলা রয়েছে ৫শ টি। প্রতিদিন একটি আদালত যদি সোয়াশ মামলা শোনেন তবে মাসে একবার মামলাগুলোর তারিখ পড়বে। যা বাস্তবে কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। আর যদি তার চেয়ে কম শোনেন তবে দেড় বা দুইমাস পর পর একেকবার একেকটি মামলা শোনা সম্ভব হবে। ওই মাসে এখানে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ১৮৯টি। আর ৩১ জানুয়ারিতে মামলা ছিল ২০ হাজার ৭৯৫টি।এদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পয়লা মার্চ মোট মামলা ছিল ৪ হাজার ৯১০টি। এর মাঝে দরখাস্ত মামলা ১ হাজার ৪৫৮টি। ফেব্রুয়ারি মাসে এখানে দায়ের হয়েছে ১১১টি মামলা। নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩০টি। সালিশ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগুলো নিষ্পত্তি হয়। ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এখানে মোট মামলা ছিল ৪ হাজার ৯২৯টি। এ আদালতের সব মামলা পরিচালনার জন্য বিচারক আছেন একজন। তাকে একটি মামলা মাসে একবার করে শুনতে হলে প্রতিদিন গড়ে শুনতে হয় সোয়া দুইশটি। যা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। এখানে এ আদালতে একেকটি মামলার তারিখ দুই/তিন মাস পর পর একবার পড়ে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এখানে বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ লাইন থাকে। ফলে মাসের পর মাস কারাভোগ করলেও শুধুমাত্র মামলার জটের কারণে উপযুক্ত বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা। আর বাদীপক্ষও বিচারের আসায় প্রতিনিয়ত আদালতে আসাযাওয়া করছেন।একইভাবে জজশীপে বিচারাধীন মামলা আছে ৬ হাজার ৯৫৬টি। এর মাঝে ৬ হাজার ২২৮টি মামলা ফৌজদারি অপরাধের এবং ৭২৮টি দেওয়ানি মামলা রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে এখানে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে ফৌজদারি অপরাধের ৩৮২টি এবং দেওয়ানি ২২টি। আর নিষ্পত্তি হয়েছে ফৌজদারি ২৪৩টি এবং দেওয়ানি ১৬টি মামলা। এখানে বিচারকের পদ আছে ১৩টি। কিন্তু কর্মরত আছেন ৯ জন। এখানে খালি আছে যুগ্ম জেলা জজ প্রথম, সিনিয়র সহকারী জজ বানিয়াচং, সহকারী জজ আজমিরীগঞ্জ ও অতিরিক্ত সহকারী জজ-এর পদ। এছাড়া যুগ্ম জেলা জজ-২ এ বিচারক আছেন কিন্তু এখানে সহায়ক কোনো কর্মচারী নাই। ডেপুটেশনে কর্মচারী দিয়ে সেখানে কাজ চালানো হচ্ছে।ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা রয়েছে ২ হাজার ২৪৩টি। ফেব্রুয়ারি মাসে দায়ের হয়েছে ১১৪টি এবং নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি মামলা। এখানে একজন বিচারক আছেন। কিন্তু এ আদালতে কোনো কর্মচারী নেই। এখানেও ডেপুটেশনে দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। ফলে মামলা পরিচালনার কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। দিন দিন এসব আদালতে শুধু মামলার জট বাড়ছেই। এতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের।জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালেহ্ উদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে জানান, নিম্ন আদালতের মামলার জট কমাতে হলে জরুরী ভিত্তিতে আরও অন্তত ২টি এজলাস বরাদ্দ দেয়া দরকার। কারণ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগণ একজন নামলে অন্যজন বসে বিচারকার্য পরিচালনা করেন। এতে বিচার বিলম্বিত হয়। যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালত পদটি খালি রয়েছে। তাই যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক উভয় আদালতের বিচারকার্য পরিচালনা করেন। এ অবস্থায় মামলার জট বাড়াটাই স্বাভাবিক। মামলার জট কমাতে হলে এখানে নতুন পদ সৃষ্টি এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আরও একটি পদ সৃষ্টি করে বিচারক নিয়োগ দিতে হবে।অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (সরকারী কৌশলী) সালেহ উদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রায় ৫ হাজার মামলা রয়েছে। যা একজন বিচারকের পক্ষে নিষ্পত্তি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দিনের পর দিন তারিখ পড়ছে। নিষ্পত্তির কোনো ব্যবস্থা হচ্ছেনা। এমনকি আপোস মামলাও নিষ্পত্তি হচ্ছেনা। এ অবস্থায় বিচার নিয়ে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। মামলার জট কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া এখন অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।জজশীপের নাজির ওসমান রেজাউল করিম জাগো নিউজকে জানান, জজ আদালতে মামলার নথিপত্র রাখা ও কর্মচারীদের বসার স্থানের মারাত্মক সঙ্কট রয়েছে। একেকটি কক্ষে ২/৩টি অফিসের কর্মচারীরা বসেন ও নথি রাখা হয়। বিচারকদের এজলাসেরও সঙ্কট রয়েছে। এজলাস সঙ্কটের কারণে ২/৩টি আদালতে পালাক্রমে বিচারকার্য পরিচালনা করা হয়। এসব কারণেই মূলত মামলার জট বাড়ছে। ইতোমধ্যে আদালত ভবন উপরের দিকে বৃদ্ধির (ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন) জন্য গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন চাওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।এফএ/এমএস