১৯৮৫ সালে বাড়ি তৈরির পর থেকে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন থেকে সর্বশেষ হোল্ডিং কর নির্ধারণ করা হয়েছিলো ৮শ টাকা। গত বছরেও ৮শ টাকাই কর দিয়েছি। এবার সেই একই বাড়ি কর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৭২ টাকায়। এভাবে এক লাফ দিয়ে এতো টাকা বাড়ির কর বাড়ালে আমরা চলবো কীভাবে? এতো এক ধরনের জুলুম করা হচ্ছে।এভাবেই কথাগুলো বলেছিলেন, রাজশাহী মহানগরীর চন্ডীপুর এলাকার ১৭৩নং হোল্ডিয়ের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। তিনি পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এদিকে, নগরীর কাজীহাটা এলাকার হোল্ডিং নং ৯৫ এর বাসিন্দা কবিতা খাতুন নামের এক গৃহবধূ জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি এক ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে ছোট একটি একতলা বাসায় বসবাস করেন। গত বছর তিনি এ বাড়ির হোল্ডিং কর দিয়েছেন ৩৪৭ টাকা। এ বছর তা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ১৩৮ টাকায়। এক সঙ্গে এতো টাকা হোল্ডিং কর বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি হতাশ। অপরদিকে, নগরীর উপশহর সপুরা এলাকার ৯৭নং হোল্ডিংয়ের বাসিন্দা অবসর প্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল কাদের জানান, গত বছর তিনি হোল্ডিং কর দিয়েছেন ১ হাজার ১৬৬ টাকা। এ বছর তার বাড়ির কর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৭৯৭ দশমিক ৭৬ টাকায়। রাসিকের এ ধরনের আচরনে রীতিমত তিনি ক্ষুদ্ধ। এসময় তিনি আরো জানান, কোনো ধরনের পূর্ববর্তী নোটিশ ছাড়াই কর বাড়ানো সম্পূর্ণ বে-আইনী। তিনি এ ব্যাপারে রাসিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। নির্ধারিত পি ফরমের মাধ্যমে আবেদন করলে, কর কমানো হতে পারে বলে আশ্বাস দিয়েছেন রাসিক কর্তৃপক্ষ। এদিকে, নগরীর সাধুরমোড় এলাকার ৩৪নং হোল্ডিং এর বাসিন্দা বেলাল হোসেন জানান, তিনি ১৯৮৫ সালে বাড়ি তৈরি করেছেন। গত বছর সর্বশেষ বাসার হোল্ডিং কর দিয়েছেন ৩৮০ টাকা। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার টাকায়। পরে তিনি রাসিকের সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ করে পি ফরমে কর কমানোর জন্য আবেদন করেছেন। এ ধরনের অভিযোগ শুধু এসব এলাকাতেই নয়, গোটা মহানগরীর ৫৬ হাজার হোল্ডিংয়ের কর এভাবেই বৃদ্ধি করা হয়েছে। সম্প্রতি রাসিক ২০১৬-১৭ সালের নির্ধারিত পৌরকর অবহিতকরণ নোটিশ দিয়েছে নগরীর হোল্ডিং মালিকদের। পূর্ব কোনো ধরনের ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে হোল্ডিং কর ৫ থেকে ১০ গুণ বৃদ্ধি করায় ক্ষুদ্ধ নগরবাসী। তাদের দাবি রাসিকের হোল্ডিং কর একবারে এতো বেশি পরিমাণ আগে কখনো বাড়েনি। শুধু তাই নয়, কর ধার্য ও মূল্যায়নের বিরুদ্ধে আপত্তিমূলক দরখাস্তের আবেদন ফরমের (পি ফরম) মূল্যে ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২শ টাকা করা হয়। পরে নগরবাসীর আপত্তির কথা বিবেচনা করে ফরমের দাম কমিয়ে করা হয়েছে একশ টাকা। এদিকে, কর মূল্যায়নে স্বেচ্ছাচারিতা ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একতলা বাড়ির কর প্রতিবেশি বাড়ির দু-তিন তলা বাড়ির চেয়েও বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ বেশি আয়তনের বাড়ির কর কম আর কম আয়তনের বাড়ির কর বেশি এমনও অভিযোগ রয়েছে। নগরীর বিভিন্ন বাড়ির হোল্ডিং মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এমনই তথ্য জানা গেছে। তবে, নগরবাসীর উপর বে-আইনি ভাবে চাপিয়ে দেয়া হোল্ডিং কর প্রত্যাহার না করলে আন্দোলনের হুসিয়ারী দিয়েছে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দরা। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে রাসিকের অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো কর প্রত্যাহার করা না হলে নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর আন্দোলন শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জামাত খান। এসময় তিনি আরো জানান, অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এ বছর হোল্ডিং কর বাড়িয়েছে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন। এভাবে নগরবাসীকে বিপদগ্রস্থ করে রাসিকের উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ নগরবাসীর সুযোগ-সুবিধার করা চিন্তা করা রাসিকের কাজ। তাই অবিলম্বে সকল বর্ধিত কর প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি। এ ব্যাপারে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা খন্দকার মাহাবুবুর রহমান জানান, মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন ট্যাক্সেশন আইন মেনেই কর নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি বাড়ির এ বছরের ভাড়া থেকে ২ মাসের ভাড়া সার্ভিস করচ হিসেবে বাদ দিয়ে বাকি ১০ মাসের ভাড়ার ৬ ভাগের এক ভাগের উপর ২৭ ভাগ কর নির্ধারণ করা হয়েছে। এক হাজার বর্গফুট একতলা পাকা বাড়ির ভাড়া ১২শ টাকা ধরে বার্ষিক ধরা হয়েছে। যা প্রচলিত ভাড়ার অনেক কম। তাই একবারে ৫ গুণ বা ১০ গুণ কর বাড়ানো হয়নি। এর আগেও এভাবেই বাড়ানো হয়েছে। পরে তা আবেদন করে কমানো হয়েছে। এবারো যদি কোনো হোল্ডিং মালিকের কর বেশি ধরা হয়েছে মনে করেন তবে পি ফরমের মাধ্যমে আবেদন করতে পারেন। নগরবাসীর সুবিধার্থে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে পি ফরমে আবেদনের বিষয়টি জানানো হয়েছে। সকল ওয়ার্ড কমিশনারের কার্যালয়ে এ আবেদন জমা দেয়ার জন্য নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। আবেদন যাচাই বাছাইকালে যদি গ্রাহকের আবেদনটি যৌক্তিক মনে হয়, তবে রিভিউ কমিটি তা মূল্যায়ন করবেন। এ ব্যাপারে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র নিযাম উল আযিম জানান, হঠাৎ করে বাড়ির কর বৃদ্ধি করা হয়েছে, তা ঠিক নয়। নিয়ম মেনেই তা বাড়ানো হয়েছে। তবে নগরবাসীর অসুবিধার কথা বিবেচনা করে বিষয়টি নিয়ে রাসিকের রাজস্ব বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে কর বিষয়ক রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যে সকল সমস্যা দূর করা হবে বলে আশ্বাস প্রদান করেন তিনি।এমএএস/এবিএস