Jago News logo
ঢাকা, সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ | ১৫ ফাল্গুন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শাহজালালের আশেপাশের কয়েক লাখ মানুষ


রফিক মজুমদার, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১:১৯ এএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার | আপডেট: ১১:৫৩ এএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শাহজালালের আশেপাশের কয়েক লাখ মানুষ ছবিটি ফাইল

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড সার্ভিস স্টাফসহ আশেপাশের কয়েক লাখ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। দিনরাতে উড়োজাহাজ ওঠানামার শব্দে ইতোমধ্যে কয়েকজন গ্রাউন্ড স্টাফ হয়েছেন শ্রবণপ্রতিবন্ধী। জনবসতি এলাকায় বিমানবন্দর মানবদেহের জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর হওয়ায় পৃথিবীর অনেক দেশেই জনমানবহীন এলাকায় বিমানবন্দর গড়ে তোলা হয়। আবার যেসব বিমানবন্দরের আশপাশে হালকা বসতি রয়েছে সেসব বিমানবন্দরে রাতের বেলায় মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটাতে ফ্লাইট উড্ডয়ন ও অবতরণ বন্ধ রাখা হলেও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চলছে উল্টোপথে।

উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের শব্দ ও এর বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে ভালো বোঝেন এমন অনেকেই বলেছেন, বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড স্টাফরা ১০০ ডেসিবল শব্দের মাত্রার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ডিউটিরত থাকে। উড়োজাহাজের ইঞ্জিন থেকে আসা শব্দের মাত্রা ৬৫ ডেসিবলের বেশি মানবদেহের জন্য শতভাগ ঝুঁকিপুর্ণ। এ কারণে উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ থেকে রক্ষা পেতে গ্রাউন্ড স্টাফদের পারর্সোনাল প্রোটেকশন ইকুয়েপমেন্ট (পিপিই) ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যা অনেক সময়ই মেনে চলছে না দেশের বিমানবন্দরে কর্মরত গ্রাউন্ড স্টাফরা। এ অবস্থায় চিরস্থায়ী বধিরতার ঝুঁকিতে রয়েছেন দেশের বিমানবন্দরগুলোতে কাজ করা প্রকৌশলী, গ্রাউন্ড সার্ভিসসহ নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত কর্তকর্তা-কর্মচারীরা।

জানা গেছে, টার্বো-প্রপেলার উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে শব্দের মাত্রা থাকে ১০০ ডেসিবেল এবং জেটইঞ্জিনচালিত উড়োজাহাজের শব্দের মাত্র ১১০-১২০ ডেসিবেল। সে হিসেবে শাহজালালসহ দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরে ওঠানামা করা বেশিরভাগ উড়োজাহাজের শব্দের মাত্রা ১০০ থেকে ১২০ ডেসিবল। যার কারণে টেক্সিওয়ে, রানওয়ে, হ্যাংগারসহ বিমানবন্দরের ভেতরে কর্মরতদের উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ থেকে রক্ষা পেতে পিপিই ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এ বিয়য়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রধান প্রকৌশলী হানিফ বলেন, প্রোটেকশন ইকুয়েপমেন্ট ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও আমাদের বেশিরভাগ স্টাফই সেটি ব্যবহার করি না। ফলে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াই। এছাড়া উড়োজাহাজের নির্ধারিত মাত্রার বেশি শব্দ মানবদেহের জন্যে ক্ষতিকর এটা সত্যি। এ বিষয়ে উড়োজাহাজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও কিছু নির্দেশনা থাকে। সেগুলো মেনে চলা গেলে উড্ডয়ন-অবতরণকালে শব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের বজলুর কবির বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড সার্ভিসে কাজ করে শেষ বয়সে শ্রবণশক্তিহীন হয়ে মারা যান। তার এ নিকটাত্নীয় জানান, গ্রাউন্ড সার্ভিসে কাজ করতে করতে শ্রবণশক্তি হারিয়েছিলেন বজলুর কবির। এটা তাকে তার কানের ডাক্তার বলেছিলেন।

শুধু বজলুর কবিরই নয়, বেঁচে থাকা বেশ কয়েকজন গ্রাউন্ড স্টাফ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন। এদের অনেকেই হিয়ারিং এইড ব্যবহার করেন। কিন্তু চাকরি হরানোর ভয়ে বিষয়টি গোপন রেখেছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাক-কান-গলা বিভাগের বিশেষজ্ঞ সার্জন ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. শেখ হাসানুর রহমান এ বিষয়ে জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশেশের মানুষের অধিকার ও সুস্বাস্থ্য সর্বাগ্রে বা সুনিশ্চিত নয়। যে কারণে বিমানবন্দরের আশপাশের কারোর শ্রবণশক্তি নষ্ট হওযা কিংবা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার কারণ খোঁজা হয় না। টার্বো-প্রপেলার উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে শব্দের মাত্রা থাকে ১০০ ডেসিবেল এবং জেটইঞ্জিনচালিত উড়োজাহাজের শব্দের মাত্র ১১০-১২০ ডেসিবেল। যা কানের জন্যে সহনীয় হলেও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ফাইটার উড়োজাহাজগুলোর শব্দের তীব্রতার মাত্র অনেক বেশি হওয়ায় ক্ষতির মাত্রাও বেশি। এ নিয়ে আমাদের দেশে কোনো গবেষণাও নেই।

তিনি বলেন, শুধু বিমানবন্দরই নয়, এর আশেপশের জনবসতি এলাকার মানবদেহের জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর হওয়ায় পৃথিবীর অনেক দেশেই জনমানবহীন এলাকায় বিমানবন্দর গড়ে তোলা হয়। আবার যেসব বিমানবন্দরের আশপাশে হালকা বসতি রয়েছে সেসব বিমানবন্দরে রাতের বেলায় মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটাতে ফ্লাইট উড্ডয়ন ও অবতরণ বন্ধ রাখা হয়।

তিনি আরও বলেন, শুধু মানুষ নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী ছোট ছোট প্রাণী ও কীটপতঙ্গের জন্যেও উচ্চশব্দ মারাত্মক ক্ষতিকর। ঝুঁকির মুখে পড়ার কারণে বিমানবন্দরের মতো শব্দের উৎসস্থল থেকে এসব প্রাণীও দূরে সরে যায়।

শাহজালালে ওঠানামা করা বেশিরভাগ উড়োজাহাজে শব্দের মাত্রা ১০০ থেকে ১২০ ডেসিবল হওয়ায় বিমানবন্দরের আশেপাশে বসবাসকারীদের হৃদরোগ এবং স্ট্রোক রোগের ঝুঁকি অনেকখানি বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জহিরুল আলম।

এ বিষয়ে বিমানের একজন পরিচালক নাম না প্রকাশের শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরের আশেপাশের কারোর শ্রবণশক্তি নষ্ট হওযা কিংবা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার কারণ খোঁজা হয় না অথচ লন্ডনের হিথ্রো কিংবা টোকিওর নারিতা বিমানবন্দরের আশেপাশের মানুষের ঘুমের অসুবিধা হবে মনে করে রাতের বেলায় কোনো ফ্লাইট ওঠানামা করতে দেয়া হয় না। এই চিত্র আরও অনেক দেশে রয়েছে।

আরএম/বিএ

আপনার মন্তব্য লিখুন...