প্রথমবার লজ্জাবতী বানরের উপর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ১২:৪৬ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০২০
ছবি : আদনান আজাদ আসিফ

নাম লজ্জাবতী বানর। তবে এই বানরের মাঝে বাদরামির চিহ্ন নেই তিল পরিমাণ। বরং লজ্জায় শরমের এক প্রতীকী ছবি দেখা যায় তাদের মাঝে। দিনের বেলায় দুই উরুর মধ্যে মাথা গুজিয়ে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। অনেক এলাকায় এদের মুখচোরা বানরও বলে; তবে বানর প্রজাতির মধ্যে এদের শামুক বানরও বলা হয়। এরা মাঝে মাঝে গাছের মগ ডালে পা দিয়ে আকড়ে ধরে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে। ঘন চীর সবুজ বনে বসবাস, চলাচল করে খুব ধীরস্থিরভাবে।

দিনের বেলায় বের হয় না, নববধূর মতো নিজেকে আড়ালে রাখতে পছন্দ করে। যত্রতত্র ঘোরাঘুরি করে না, নিজের এলাকা ছেড়ে যেতে চায় না।

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো লজ্জাবতী বানরের ওপর মাঠ পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিচালনা করা হয়। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত দুই বছরমেয়াদি এ গবেষণার ফল বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশের অপেক্ষায়।

jagonews24

লজ্জাবতী বানরের গবেষক হাসান আল-রাজী চয়নের নেতৃত্বে চার সদস্যের দল সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জের সাতছড়ি, রেমা-কালেঙ্গা ও মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া এবং আদমপুর বনে এ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এবং এ গবেষণা কাজের সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবির বিন মুজাফফর।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই গবেষণা কার্যক্রমে দীর্ঘ দুই বছরে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ২৩টি, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ৩৩টি, রেমা–কালেঙ্গা বনে ৮টি এবং আদমপুরে ৪টি লজ্জাবতী বানরের সাথে সরাসরি দেখা হয় গবেষকদের। যেহেতু আন্তর্জাতিক গবেষণায় পূর্ণাঙ্গ গবেষণা কাজের জন্য নতুন ট্রেইল নির্মাণ করা হলেও বাংলাদেশের বন বিভাগ নতুন ট্রেইল শুধু গবেষণার জন্য নির্মাণের পক্ষে নয়।

গবেষণার সময় গবেষক দলকে বর্তমানে বিদ্যমান ট্রেইল ধরে হেঁটেই রাতের বেলায় এ জরিপের কাজ পরিচালনা করতে হয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও প্রথমবারের মতো লজ্জাবতী বানর নিয়ে গবেষণা করতে পেরে তৃপ্ত গবেষক দল। এ গবেষণা দেশে লজ্জাবতী বানর সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।

গবেষক দলের প্রধান হাসান আল রাজী চয়ন জানান, আমরা কোনো নতুন ট্রেইল নির্মাণ করতে পারিনি পুরোনো যে ট্রেইল ছিল তা ধরেই জরিপ করেছি এবং যেহেতু এই বানর রাতের বেলা সক্রিয় থাকে তাই রাতেই পুরো গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে প্রতি কিলোমিটারে ১.৭৮টি, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রতি কিলোমিটারে ০.৮২টি, রেমা-কালেঙ্গা বনে প্রতি কিলোমিটারে ০.৩৬টি ও আদমপুরে প্রতি কিলোমিটারে ০.১৩টি লজ্জাবতী বানর পাওয়া গেছে।

jagonews24

শুধু সাতছড়ি বনের ক্ষেত্রে ডিসটেন্স স্যামপ্লিং ম্যাথড ব্যবহার করে পুরো বনের লজ্জাবতী বানরের একটি সম্ভাব্য সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ৩০ থেকে ৩৮টি লজ্জাবতী বানরের অস্তিত্ব আছে। অন্যদিকে অন্যান্য বনে ডিসটেন্স স্যামপ্লিং ম্যাথড ব্যবহার করতে না পারায় ওই বনগুলোতে লজ্জাবতী বানরের সংখ্যা নিয়ে কোনো ধারণা করা সম্ভব হয়নি। লজ্জাবতী বানর নিশাচর এবং বৃক্ষবাসী প্রাণী। খুব বিপদে না পড়লে এরা গাছ থেকে মাটিতে নামে না। এদের সংরক্ষণের জন্য বনে গাছের পরিমাণ বাড়াতে হবে, যাতে করে নিরবচ্ছিন্ন আচ্ছাদন থাকে।

গবেষক দল জানায়, লজ্জাবতী বানর একটি নিশাচর প্রাণী। আমরা দীর্ঘ ১৭ মাস এদের গতিবিধি নিয়ে কাজ করেছি। আমাদের তথ্য মতে, এরা সন্ধ্যার পরপর সক্রিয় হয়। এরা রাতে সক্রিয় থাকার সময়ের মাঝে বেশি সময় ব্যয় করে ঘুরে বেড়াতে। খাদ্য গ্রহণ এবং বিশ্রামের জন্য এরা প্রায় সমান পরিমাণ সময় ব্যয় করে। মাজার বিষয় হলো মহিলা লজ্জাবতী বানর পুরুষের তুলনায় বেশি ঘুমায় এবং বিশ্রাম নেয়।

শীতকালে এদের স্বাভাবিক চলাফেরা কিছুটা কমে যায়। এরা রাতে সক্রিয় থাকাকালীন প্রাকৃতিক বনেই বেশি থাকে। তবে খাবার খাওয়ার জন্য এরা লেবু বাগানে আসে, যেখানে জিগা গাছ বেশি থাকে। জেলির মতো দেখতে জিগা গাছের আঠা এদের সব থেকে প্রিয় খাবার।

যেহেতু এরা প্রাকৃতিক বনে বেশি থাকে আর আঠা এদের প্রধান খাবার, তাই এদের টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাকৃতিক বন রক্ষার পাশাপাশি আঠা উৎপাদনকারী গাছ যেমন- জিগা, বহেরা, রঙ্গি বনে আছে কিনা সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।

বর্তনামে এই লজ্জাবতী বানরের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে লজ্জাবতী বানরের প্রধান হুমকি হলো বনের মাঝের সড়ক এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের তার। বনের ভিতরে থাকা রাস্তায় গাড়ির নিচে চাপা পড়ে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের তারে ত্বড়িতায়িত হয়ে অনেক সময় লজ্জাবতী বানর মারা যায়।

jagonews24

লজ্জাবতী বানরের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধ করতে বনের মাঝে রাস্তায় যাতে অধিক গতিতে যানবাহন না চলে সেদিকে নজর রাখতে হবে এবং বনের ভিতরে বিদ্যুৎ সরবরাহের তারে অবশ্যই বিদ্যুৎ অপরিবাহী উপাদানের আবরণ ব্যবহার করতে হবে বলে তাদের পরামর্শ।

গবেষণার তথ্যের সাথে মিল পাওয়া গেছে বাস্তবতার। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের (শ্রীমঙ্গল) পরিচালক সজল দেব জানান, চলতি বছর বিদ্যুতায়িত দুটি এবং খাবারের সন্ধানে বনের বাইরে চলে আসা দুটি আহত বানরকে উদ্ধার করে তারা সুস্থ করে তুলেছেন।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগ) রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, যেকোন বনের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ আমরা দিতে চাই না। অনেক সময় জাতীয় স্বার্থে দিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই রাবার দিয়ে তার মোড়ে দিতে হয়। বানরজাতীয় প্রাণীর জন্য উন্মুক্ত তার সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। এ নিয়ে কথা হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে। দ্রুত এ তারগুলো রাবার দিয়ে মুড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হবে।

এমএমএফ/এসইউ/এএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]