দেশজুড়ে

হবিগঞ্জে পথশিশুদের নিয়ে ব্যতিক্রমী পাঠশালা `দুই শূন্য শূন্য ছয়`

হবিগঞ্জে পথশিশুদের নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ব্যতিক্রমী এক পাঠশালা। রাস্তা থেকে ধরে এনে এখানে এসব শিশুদের শিক্ষা দেয়া হয়। এরপর ভর্তি করে দেয়া হয় বিভিন্ন স্কুলে। তাদের বই, খাতা, কলম সব কিছুই পাঠশালা থেকেই দেয়া হয়। পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের সচেতন করতেও নেয়া হয় নানা উদ্যোগ। প্রতিনিয়তই বাড়িতে গিয়ে তাদের অভিভাবকদের দেয়া হয় নানা পরামর্শ। এমন মহতি উদ্যোগ হাতে নিয়েছে ২০০৬ সালে এসএসসি পাশ করা কয়েকজন শিক্ষিত যুবক। তারা প্রতিষ্ঠা করেছে ‘দুই শূন্য শূন্য ছয়’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন। এর মাধ্যমেই সম্পূর্ণ নিজ খরচে তারা পরিচালনা করছে এ পাঠশালা। তাদের উৎসাহ দিতে পাঠশালা পরিচালনার জন্য অডিটোরিয়ামে জায়গা করে দিয়েছেন হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।সংগঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা মো. জাকারিয়া রকি জাগো নিউজকে জানান, এসব শিশুদের অধিকাংশই টোকাই ছিল। তাদের রাস্তা থেকে ধরে আনা হয়েছে। তাদের অভিভাবকরা দিনমজুর, কেউ আবার রিকশা চালায়। সন্তানদের তারা পড়তে দিতে চায়না। তিনি আরো বলেন, আমরা বাড়িতে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে এসব শিশুদের পড়তে নিয়ে আসি। প্রথমে আমাদের অনেক সমস্যা হতো। শিশুদের বার বার রাস্তা থেকে ধরে আনতে হতো, বাড়িতে গিয়ে তাদের অভিভাবকদের বোঝাতে হতো।সংগঠনের আরেক উদ্যোক্তা ও পাঠশালার শিক্ষক ওয়াসিফ জাগো নিউজকে জানান, পাঠশালার প্রতিষ্ঠাকালে তারা সবাই ছাত্র ছিলেন। তাই সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আর্থিক সমস্যা। এখনো অনেকেই পড়ছেন। বেশ কয়েকজন আবার প্রবাসেও চলে গেছেন। কেউ কেউ চাকরি করছেন। এরপরও তারা এটিকে নিজেদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান মনে করেন। সবাই চান যেন এটি টিকে থাকে। ভবিষ্যতে তারা আরো বড় পরিসরে বঞ্চিত শিশুদের পাঠদান করতে চান। তিনি আরো বলেন, তাদের পড়ার উৎসাহ এবং পরীক্ষার ফলাফল আমাদের উৎসাহিত করেছে। সপ্তাহে ৩ দিন তাদের ক্লাস নেয়া হয়। বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত তাদের ক্লাস নেয়া হয়।শিক্ষিকা নূরুন্নাহার চৌধুরী নেভি ও মহিমা জানান, শিশুরা পড়তে বেশ আগ্রহী। তাই তাদের পড়াতেও নিজেদের খুব ভালো লাগছে। শিক্ষার্থী আছরাত জাহান শীলা ও মাহমুদা আক্তার সাজু জানায়, তারা দুইজনেই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। তাদের স্কুলে ভর্তি করা, বই, খাতা, কলম সবই দিচ্ছে এ সংগঠনটি। এখানে পড়তেও তাদের অনেক ভালো লাগে। দুই বছর ধরে তারা এখানে পড়ছে। চৌধুরী বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিরিন আক্তার সাথি ও হবিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র তামিম জানায়, সব বিষয়ে এখানে পড়ানো হয়। এ সংগঠনের কর্মকর্তারা তাদের গিয়ে বুঝিয়ে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। এখন তারা বিদ্যালয়ে পড়তে পেরে আনন্দবোধ করছে।সংগঠনের উদ্যোক্তারা জানান, ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর দুই শূন্য শূন্য ছয় সংগঠনটি যাত্রা শুরু করে। সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ছিল ১৪০ জন। তারা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন জেলা শহরে অসংখ্য পথশিশু রয়েছে, যারা সুবিধা বঞ্চিত তাদের জন্য কিছু করবেন। অনেকেই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, এটি ওটি কুড়িয়ে নিয়ে বিক্রি করে, বস্তিতে থাকে। এসব শিশুদের জন্য তারা কিছু করতে চান। এমন আকাঙ্ক্ষা থেকেই সংগঠনটি কাজ শুরু করে। প্রথমে শুধু সুবিধা বঞ্চিতদের নিয়ে খেলাধুলার আয়োজন করা হতো। ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট শুরু করা হয় পাঠশালা। ১৫/২০ জনকে নিয়ে এ পাঠশালা শুরু হয়। বর্তমানে এখানে ৭০ জন পথশিশু পড়াশুনা করছে। রাস্তা থেকে তাদের ধরে এনে পড়াশুনা করানো হতো। শুরুর দিকে তাদের পড়ানো হতো হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে গাছ তলায় বসে পড়ানো হতো। পরবর্তীতে তাদের এ মহতি উদ্যোগ দেখে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের পাঠশালাটি পরিচালনার জন্য বিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে জায়গা করে দেন।তাদের নিয়ে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান। খেলাধুলা করানো হয়। পাঠশালায় চারজন শিক্ষক রয়েছেন। এর মাঝে দুইজন স্বেচ্ছাসেবী এবং দুইজন সম্মানীর বিনিময়ে। তাদের মাসে ৫ হাজার টাকা খরচ দেয়া হয়। প্রতি ঈদ, বিভিন্ন উৎসব ও শীতে তাদের জামা কিনে দেয়া হয়। এখান থেকে এসব শিশুদের বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি করে দেয়া, তাদের বই, খাতা, কলম এসব সংগঠন থেকেই দেয়া হয়। এ পাঠশালাকে আরো বড় পরিসরে চালু করার ইচ্ছে রয়েছে প্রচারবিমুখ এ যুবকদের। তারা প্রচারণা চায় না, চায় দেশ ও সমাজকে কিছু দিতে। কিন্তু আর্থিক টানা পোড়েনের কারণে অনেক কিছুই করা হয়ে উঠে না। অনেক কষ্টে তাদের হাতে গড়া প্রাণের এ প্রতিষ্ঠান।সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন/এআরএ/এমএস