রোয়ানুর আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত উপকূলের মানুষগুলো দুর্বিষহ দিন পার করছেন। জলোচ্ছ্বাসে বিলীন হয়ে যাওয়া বেড়িবাঁধ দিয়ে উপকূলীয় এলাকায় চলছে জোয়ার-ভাটা। সবচেয়ে বেশি মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া ও কক্সবাজার সদর উপজেলার উপকূলবর্তী মানুষ। ঘূর্ণিঝড় চলে গেলেও রয়ে গেছে ক্ষতের আছড়। তাই বিলীন হওয়া বাঁধের অংশ দিয়ে এলাকায় জোয়ার ভাটা চলছে। পানিবন্দী দূর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন লাখো মানুষ। প্লাবনটি রাত এবং দিন তফাতে হওয়ায় প্রাণহানি কম হলেও ক্ষয়ক্ষতির দিক দিয়ে ২৫ বছর আগের ১৯৯১ সালের জলোচ্ছ্বাসের মতোই আচড় লাগিয়েছে রোয়ানু। এমনটিই মনে করছেন উপকূলের বোদ্ধারা। দূর্গত এলাকায় শুকনো খাবার ও পানি দিয়ে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে প্রশাসন। কিন্তু এক সঙ্গে উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া এতোগুলো মানুষকে দ্রুত মাথার উপর ছাদ করে দেয়া প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বয়োবৃদ্ধ ও বাচ্চা নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্র, অর্ধ ভঙুর বাসাবাড়ি কিংবা স্বজনদের ঘরে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন ঘূর্ণিঝড় দূর্গত মানুষগুলো। কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী জানান, দ্বীপ কুতুবদিয়ার চারপাশের প্রায় ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। জোয়ারের চেয়ে ৫-৬ ফুট উঁচুতে প্রবাহিত জলোচ্ছ্বাসের পানির তোড়ে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার ৮ থেকে ১০ হাজার বাড়িঘর। তিনি আরও বলেন, আংশিক ক্ষতির মুখে পড়েছে আরও ৩-৪ হাজার ঘরবাড়ি। ঘূর্ণিঝড় চলে গেলেও সাগরের জোয়ার-ভাটার অংশ হয়ে পড়েছে দ্বীপের উত্তর ধূরুং, দক্ষিণ ধূরুং, লেমশীখালী ও আলী আকবর ডেইল এলাকা। রোয়ানুর আঘাতে রাস্তা-ঘাট, বাড়ি-ঘর, লবণ, চিংড়ি ও পুকুরে করা মৎস্য ঘের ও বেড়িবাঁধসহ শত কোটি টাকার উপর ক্ষতি হয়েছে। রোয়ানুর তীব্রতায় চরম উদ্বাস্তু করে দেয়া হয়েছে মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা, মাতারবাড়ি ও কুতুবজুম এলাকাকে। এমনটি দাবি ধলঘাটা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান কামরুল হাসানের। তিনি দাবি করেন, ধলঘাটা চারপাশেই সাগর বেস্টিত। ইউনিয়নটি চতুর্পাশের ১৮ কিলোমিটার বাঁধের প্রায় ১৫ কিলোমিটার বিলীন হয়ে এলাকায় জোয়ার-ভাটা চলছে। ৯ ওয়ার্ড়ের প্রায় ৩ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মাঝে প্রায় ১৬ পরিবার সম্পূর্ণভাবে ক্ষতির মুখে পড়েন। ৬০০ থেকে ৮০০ পরিবার আংশিক ক্ষতির মুখে পড়ে দুর্গত জীবন কাটাচ্ছেন। একই অবস্থা তার পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন মাতারবাড়িরও। সেখানেও মানুষের ঘরবাড়ির পাশাপাশি জলোচ্ছ্বাসের আঘাতের থাবায় পড়েছে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটি। নিচতলার অর্ধেকাংশ পানিতে ডুবে থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল দস্তাবেজ ক্ষতির মুখে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সমুদ্র তীরের বেড়িবাঁধ। মহেশখালী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম জানান, মহেশখালীর দুর্যোগ কবলিত এলাকায় জরুরি ত্রাণ হিসেবে শুকনো খাবার চিড়া, মুড়ি, গুড় ও বিশুদ্ধ খাবার পানি বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। পেকুয়া উপজেলা চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ রাজু জানান, প্রশাসন ও স্থানীয়ভাবে এলাকার লোকজনের মাঝে আগে থেকেই সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রাণহানি রোধ করা গেলেও সম্পদের ক্ষয় রোধ করা সম্ভব হয়নি। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫-৬ ফুট জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে চিংড়ি প্রজেক্ট, লবণ চাষীদের মজুদকৃত লবণ পানিতে তলিয়ে নিয়েছে। সঙ্গে বিধ্বস্ত হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার ঘরবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এতে দেড়শ কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি। তার মতে, ১৯৯১ সালে অসচেতনতার কারণে অনেক প্রাণহানি ঘটে। সঙ্গে সম্পদহানিও হয় প্রচুর। এবার প্রাণহানি না হলেও সহায় সম্পদ হারিয়ে এক প্রকার অসহায় হয়ে পড়েছেন দূর্গত এলাকার লোজকন। মগনামার চেয়ারম্যান শরাফতউল্লাহ জানান, পশ্চিমকূল, পশ্চিমবাজারপাড়া, কাকপাড়া পয়েন্ট, শরৎঘোনা, ছেপটাখালী, আধারঘোনা, রাজাখালীর টেকঘোনাসহ কয়েক পয়েন্টে এবং উজানটিয়ার ছিরাদিয়া, বিলহাছুরা ও বাঘগুজরার বেড়িবাঁধ ভেঙে এখনো জোয়াভাটা চলছে। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফুর রশিদ খান জানিয়েছেন, প্রশাসন সাধ্যমতো ত্রাণ কার্যক্রম পুর্নবাসনের ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে। চকরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জাফর আলম এমএ জানান, চকরিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে ভেঙে গেছে প্রায় ৮শ কাঁচা ঘর-বাড়ি ও বিপুল পরিমাণ গাছপালা। পানির প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের একাধিক স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে সমুদ্রের লোনা পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে। বেড়িবাঁধের প্রায় ২৫টি স্পট ভেঙে গেছে। এতে উপজেলার রামপুর, চরণদ্বীপ, খুটাখালীর বহলতলী, ডুলাহাজরা, বদরখালীসহ অন্তত ১ হাজার চিংড়ি ঘের ও ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর কয়েক ফুট পানিতে তলিয়ে গিয়ে প্রায় ৯০ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে বলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমানের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন তিনি। কক্সবাজার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু তালেব জানান, সদরের উপকূলীয় পোকখালীর পশ্চিম গোমাতলী বাঁশখালীপাড়া ও উত্তর গোমাতলী এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে বৃহত্তর গোমতলীর প্রায় ১০ হাজার একর চিংড়ি ঘের ৫-৭ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর। পানির সঙ্গে মিলিয়ে গেছে কোটি টাকার লবণ। রোয়ানুর তীব্রতা কমে গেলেও ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। ফলে ডুবে থাকছে রাস্তাঘাট। এছাড়াও সদরের খুরুশকুল, চৌফলদন্ডী, পোকখালী, গোমাতলীসহ পুরো মহেশখালী চ্যানেলের অর্ধশতাধিক বিভিন্ন প্রজাতির মাছের ঘের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে সাগরে তলিয়ে গেছে কোটি টাকার চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ। কক্সবাজার পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মাহাবুবুর রহমান জানান, ১৯৯১ এর ঘূর্ণিঝড়ের আদলেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন সাগর তীরবর্তী এলাকার লোকজন। দেশের সবচেয়ে বড় শুটকি মহাল নাজিরারটেক এলাকায় নষ্ট হয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকার শুটকি। এছাড়াও পৌরসভার ১ নং ও ২ নং ওয়ার্ডের কুতুবদিয়া পাড়া, চরপাড়া, সমতিপাড়া, নুনিয়ারছড়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব না থাকলেও মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে সাগর এখনো উত্তাল রয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, রোয়ানুর তীব্রতা কমার পর ভেসে উঠেছে ক্ষয়-ক্ষতির চিত্র। উপকূলের বিভিন্ন এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। এসব এলাকার লোকজনের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে সরকারের আন্তরিকতার কমতি নেই। দুর্গত মানুষগুলোকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যানদের নির্দেশনা দেয়া আছে এবং সেভাবেই কাজ করছে প্রশাসন। এসএস/পিআর