বিশেষ প্রতিবেদন

বিলুপ্তির পথে কবি নজরুলের স্মৃতিচিহ্ন

আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৫ মে, বুধবার) প্রেম, দ্রোহ, মানবতা ও সাম্যের প্রতীক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৭তম জন্মজয়ন্তী। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও স্থানীয় প্রশাসন ও নজরুল প্রেমীদের উদ্যোগে জেলার মুরাদনগরের কবি তীর্থ দৌলতপুরে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়েই এ দিবসটি পালিত হচ্ছে। কুমিল্লা শহর ও মুরাদনগরের দৌলতপুরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কবির স্মৃতি চিহ্ন। প্রতি বছর কবির জন্ম ও মৃত্যু-বার্ষিকীতে কবির স্মৃতি রক্ষায় সরকার ও নজরুল প্রেমীদের অনেক প্রতিশ্রুতি ও তৎপরতা দেখা দিলেও পরে কবির স্মৃতিচিহ্ন রক্ষা কিংবা সংরক্ষণে নেয়া হয় না কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। সংরক্ষণ আর বেদখলের কারণে কুমিল্লায় কবির অনেক স্মৃতিচিহ্ন এখন বিলুপ্তির পথে। কবি তীর্থ মুরাদনগরের দৌলতপুরে কবি নজরুল-নার্গিসের নামে মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার সরকারি প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়াও ওই গ্রামে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত কবি নজরুল-নার্গিস বিদ্যা নিকেতন সরকারি এমপিওর জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে বছরের পর বছর। জানা যায়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২১ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত কুমিল্লায় আসেন ৫ বার। কবির বিয়ে থেকে শুরু করে দু’দফায় গ্রেফতার হন এ জেলায়। কুমিল্লার গোমতীর এপারে প্রমীলা ওপারে নার্গিস। কবি নজরুল ইসলামের হৃদয়ের দুই সারথী। এ দু’জনকে ঘিরেই কবি নজরুলের প্রেম আর বিরহের অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত কেটেছে কুমিল্লা শহর ও মুরাদনগরের দৌলতপুরে। কুমিল্লা শহর ও দৌলতপুর থেকে কবির অনেক স্মৃতিচিহ্ন এখন বিলুপ্তির পথে। শহরে প্রমীলা দেবীর বাড়ি, ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ে কবিতা গানের আসর, ঝাউতলায় গ্রেফতার হওয়া, বসন্ত স্মৃতি পাঠাগার, নানুয়া দীঘির পাড়, দারোগা বাড়ি, ইউছুফ স্কুল রোড, মহেশাঙ্গন, কুমিল্লা বীরচন্দ্র নগর মিলনায়তন ও মাঠ, দক্ষিণ চর্থায় শচীন দেব বর্মনের বাড়ি, নবাব বাড়ি, ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের বাড়ি। এছাড়া নজরুল এভিনিউ, কান্দিরপাড়, ঝাউতলা, রানীর দীঘির পাড়, রেলস্টেশন, কোতোয়ালি থানা, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার এবং মুরাদনগরের দৌলতপুরসহ কুমিল্লা শহরের অসংখ্য স্থানে কবির স্মৃতি চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যা সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেক স্থানে নেই কোনো স্মৃতি ফলক। কিছু স্থানে স্মৃতি ফলক স্থাপন করা হলে তাও এখন অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে। ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে কবির প্রথম আগমন ঘটে জেলার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে। এ গ্রামেরই কবির পূর্ব পরিচিত বন্ধু আলী আকবর খানের আমন্ত্রণে। দৌলতপুরেই তিনি রচনা করেন অগ্নিবীণাসহ অসংখ্য গান-কবিতা। এ সময় আলী আকবর খানের বোনের মেয়ে সৈয়দা নার্গিস আরা খানমের মাঝে তার মানসীর ছবি খুঁজে পান। দু’জন দু’জনার কাছাকাছি আসেন।  এ প্রেম পল্লবিত হয়ে প্রণয়ে পরিণত হয়। কবি নার্গিসকে একই বছরের ১৭ জুন বিয়ে করেন। যা ছিল তার জীবনের প্রথম বিয়ে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কবি বাসর রাতেই দৌলতপুর ছেড়ে কুমিল্লা শহরে চলে আসেন। শহরে কবি ইন্দকুমার সেনের বাসায় অবস্থান করেন। দৌলতপুরে মামার বাড়িতে কবির সঙ্গে নার্গিসের বিয়ে স্থায়ী না হলেও শহরে কবি ইন্দকুমার সেনের বাসায় অবস্থানকালে তার ভ্রাতৃজয়া গিরিলা দেবীর একমাত্র কন্যা আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে প্রমীলার (কবির দেয়া নাম) সঙ্গে পরিচয় প্রেম এবং তারপর ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল শুক্রবার কলকাতার ৬নং হাজী লেনে তাদের বিয়ে হয়। কবি দ্বিতীয়বার কুমিল্লায় আসেন ১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে। এ সময়ে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী গান গাইবার কারণে গ্রেফতার হন। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর শহরের ঝাউতলা থেকে দ্বিতীয়বারের মতো গ্রেফতার হন কবি। সর্বশেষ কবি পঞ্চমবারের মতো কুমিল্লায় আসেন ১৯২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর পরই। এ ছিল তার কুমিল্লায় শেষ আসা। কবি নজরুল আর নার্গিসের বিচ্ছেদ হলেও ১৫ বছর অপেক্ষার পর কলকাতা থেকে তার তালাকনামা এনে নার্গিস পরে কবি আজিজুল হাকিমের সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৮৩ সালে কবির স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহে তৎকালীন জেলা প্রশাসক হেদায়েতুল ইসলাম চৌধুরী জেলা পরিষদের আর্থিক সহায়তায় শ্বেতপাথরের ফলক লাগানো হয়। এসব ফলকে কবির গান, কবিতা, ছড়া ও বাণী তুলে ধরা হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে কুমিল্লায় নজরুল স্মৃতিগুলো বেদখল হয়ে গেছে। এখন অনেক স্মৃতি ফলকও নেই। ১৯৬২ কুমিল্লার তৎকালীন জেলা প্রশাসক কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ কুমিল্লার কান্দিরপাড়-ধর্মপুর রেলস্টেশন সড়কের নজরুল এভিনিউ নামকরণ করেন। শহরের ফরিদা বিদ্যায়তনের পাশে যেখানে প্রমীলা দেবীর বাড়ি ছিল সেখানেও চোখে পড়ার মতো কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। তবে প্রমীলার বাড়ি ও পুকুর পাড় থেকে স্মৃতিফলক উঠিয়ে এনে রাস্তার বিপরীত পাশে ফরিদা বিদ্যায়তনের পাশে বসিয়ে রাখা হয়েছে। স্মৃতিফলক নেই কুমিল্লা রেলস্টেশন ও কোতোয়ালি থানায়ও। দক্ষিণ চর্থায় বর্তমান সরকারি হাঁস-মুরগি খামারের পাশে কুমার শচীন দেব বর্মনের যে বাড়িতে বসে কবি সঙ্গীত চর্চা করতেন সেখানে ১৯৮৩ সালের ২৯ আগস্ট নজরুল স্মৃতি রক্ষা পরিষদ একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করার পরও কবি কিংবা শচীন কর্তার স্মৃতি রক্ষায় দীর্ঘ দিন সেই বাড়িটি পরিত্যক্ত ছিল। কিন্তু গত বছর কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোলের উদ্যোগে তা সংস্কারের কাজ শুরু হয়। তবে দৌলতপুরে- নজরুল নার্গিসের স্মৃতি চিহ্ন, বাসর রাতের খাটিয়া সংরক্ষণ, পিকনিক কর্নার তৈরি, নজরুল গবেষণাগার তৈরি করার আশ্বাস ফি-বছর প্রশাসন ও নজরুল প্রেমীদের নিকট থেকে দেয়া হলেও আদৌ এ গুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। দৌলতপুরে কবিপত্নী নার্গিস বংশের উত্তরসূরী বাবলু আলী খান জানান, এ বাড়ির পুকুর ঘাটের আমগাছ তলায় কবি দুপুরে শীতল পাটিতে বসে গান ও কবিতা লিখতেন। খান বাড়ির ছেলে-মেয়েদের নাচ, গান ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখাতেন। পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটতেন। কবি শখ করে পুকুরে জাল আর পলো দিয়ে মাছ শিকার করতেন। এ গ্রামে কবির অসংখ্য স্মৃতি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হলেও সরকারকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। তবে আশার কথা হলো, মহানগরীর ধর্মসাগর উত্তর পাড়ে বিগত ২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। কুমিল্লার নজরুল অনুরাগীরা জানান, নজরুলের স্মৃতিফলকগুলো আরও নান্দনিকভাবে স্থাপনসহ নজরুলের ছবি দিয়ে বিলবোর্ড আকারে তথ্য সমৃদ্ধ ফলক স্থাপন করতে পারলে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা ঐতিহাসিক পুরাকীর্তির জেলা কুমিল্লাকে ঘিরে কবি নজরুল সম্পর্কে আরও বেশি জ্ঞান লাভ করতে পারবে।  দু’ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালাকবির স্মৃতি বিজড়িত কবিতীর্থ দৌলতপুরে কবির ১১৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ ২৫ মে (বুধবার) বিকাল সাড়ে ৪ টায় দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। প্রথম দিনের কর্মসূচিতে রয়েছে- আলোচনা সভা, নজরুল সঙ্গীত ও নৃত্যানুষ্ঠান। এছাড়াও রাত ৮টায় রয়েছে স্থানীয় নার্গিস-নজরুল শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনায় নাটক ‘মধুমালা’। এ উপলক্ষে গ্রামটিতে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। শুরু হয়েছে ‘নজরুল গ্রামীণ মেলা’। ২৬ মে বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় দৌলতপুরের নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘দৌলতপুরে নজরুল’ শীর্ষক আলোচনা সভা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন- এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন এমপি। সভাপতিত্ব করবেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন ও উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ আব্দুল কাইয়ূম খসরু। স্বাগত বক্তব্য রাখবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিন। অনুষ্ঠানে কুমিল্লার দুই নজরুল গবেষক ও লেখক অধ্যাপক শান্তি রঞ্জন ভৌমিক এবং ড. আলী হোসেন চেীধুরীকে সংবর্ধনা দেয়া হবে। আলোচনা সভা ও সংবর্ধনা শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেশ বরেণ্য নজরুল সঙ্গীত শিল্পীবৃন্দসহ মুরাদনগর, দেবিদ্বার ও নবীনগর উপজেলার শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করবে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। এসএস/পিআর