বিশেষ প্রতিবেদন

নজরুলের স্মৃতিধন্য মানিকগঞ্জের তেওতা গ্রাম

কাজী নজরুলের স্মৃতিধন্য হয়ে আছে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রাম। সহধর্মীনি আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে প্রমীলার জন্মস্থান হওয়ায় যমুনা পাড়ের এই গ্রামে কবি এসেছেন বেশ কয়েক বার।তেওতা জমিদার বাড়ির পুকুরে তিনি সাঁতার কেটেছেন, সান বাঁধানো ঘাটে বকুল তলায় বসে বাজিয়েছেন বাঁশি। লিখেছেন অনেক গান ও কবিতা। সে সব কিংবদন্তি হয়ে আছে মানুষের মুখে মুখে।যমুনা নদীর কূলঘেঁষা সবুজ শ্যামল গাছ পালায় ঢাকা তেওতা গ্রামটিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে জমিদার শ্যামশংকর রায়ের প্রতিষ্ঠিত  নবরত্ন মঠটি। সুউচ্চ নবরত্ন মঠে দাঁড়ালে মনে হতো হাত বাড়ালেই যমুনার শীতল জলের ছোঁয়া পাওয়া যাবে। জমিদারের বাড়ির আঙিনার এই মঠকে ঘিরে দোলপূজা আর দুর্গাপূজার রঙিন উৎসব পালিত হতো। এই গ্রামেরই মেয়ে প্রমীলা। জমিদার বাড়ির পাশেই বসন্তকুমার সেন আর গিরিবালা সেন দম্পতির মেয়ে আশালতা সেন গুপ্তা বা প্রমীলা নজরুল। ডাক নাম দুলি। ছন্নছাড়া, ভবঘুরে প্রেমের কবি নজরুল কয়েক দফায় এসেছিলেন এই গ্রামে। ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নজরুলের লেখা `আনন্দময়ীর আগমনে` কবিতাটি ধুমকেতু পত্রিকায় প্রকাশ হলে ব্রিটিশ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে।প্রমীলাকে নিয়ে তেওতা গ্রামে আত্মগোপন করেন নজরুল। আত্মগোপনে থাকলেও দুরন্ত নজরুল অবশ্য ঘরের কোণে বসে থাকেন নি। যমুনার ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা সবুজ শ্যামল পাখিডাকা তেওতা গ্রামে ছুটে বেড়িয়েছেন। গান, কবিতা আর অট্টহাসিতে পুরো গ্রামের মানুষকে আনন্দে মাতিয়েছেন। কখনও বা জমিদার বাড়ির শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে জ্যোৎস্না রাতে করুন সুরে বাঁশি বাজিয়ে বিমোহিত করেছে রাতজাগা গ্রামের মানুষকে। নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম চৌধুরী দাবি করছেন, বিয়ের আগেও নজরুল তেওতা গ্রামে এসেছিলেন। জমিদার কিরণশঙ্কর রায়ের আমন্ত্রণে একবার নজরুল তার অতিথি হয়ে আসেন। আর সে সময়ই নজরুল এবং প্রমীলার দেখা হয়েছিল। জমিদার বাড়ির পাশের বাড়ি বসন্তকুমারের মেয়ে দুলি (প্রমীলা) ছিলেন তখনকার জমিদার কিরনশঙ্কর রায়ের স্নেহধন্য। বেড়াতে এসে নজরুল জমিদার বাড়িতে প্রতি রাতেই গান বাজনার আসর বসাতেন। আর সেখানে একমাত্র গায়ক ছিলেন নজরুল। দুলি তখন মাত্র কয়েক বছরের বালিকা। নজরুল গানের ফাঁকে ফাঁকে পান খেতেন। আর দুলির দায়িত্ব ছিল তার হাতে পান তুলে দেয়া। রফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, তখন প্রেম ভালোবাসার মত বয়স দুলির ছিল না। আর তা হয়ও নি।পরবর্তীতে কুমিল্লায় আবার দুজনের দেখা হয়। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের সাথে প্রমীলা চলে যায় কুমিল্লায় কাকা ইন্দ্রকুমার সেনের কাছে। এদিকে বন্ধু আলী আকবরে সঙ্গে নজরুল বেড়াতে আসেন কুমিল্লায়। আলী আকবরদের দৌলতপুরের বাড়িতে যাওয়ার পথে পূর্ব পরিচিত ইন্দ্রকুমারের বাড়িতে নজরুলকে নিয়ে যায় আলী আকবর। এখানেই আবার নজরুলের সঙ্গে প্রমীলার দেখা হয় বলে রফিকুল ইসলামের দাবি। পরবর্তীতে বিয়ের রাতেই নার্গিসদের বাড়ি থেকে চলে এসে নজরুল অসুস্থ অবস্থায় আশ্রয় নেয় ইন্দ্রকুমারের বাড়িতে। এখানে বেশ কিছুদিন থাকার সময় প্রমীলার সঙ্গে নজরুলের প্রেমের সম্পর্ক এবং পরবর্তীতে বিয়ে হয়। বিয়ের পর তেওতার জমিদার কিরণশঙ্কর রায়ের আমন্ত্রণে নজরুল নববধূকে নিয়ে আবার তেওতায় আসেন। প্রায় দুই সপ্তাহ থাকার সময় জমিদারবাড়িতে নজরুলের গান ও কবিতার আসর বসতো। দর্শকের আসনে জমিদার পরিবারের পাশে প্রমীলাও থাকতো। আর নজরুল যখন `তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সেকি মোর অপরাধ....  অথবা, মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেব খোঁপায় তারার ফুল গান গাইতেন তখন লজ্জায় রক্তিম হতেন প্রমীলা। ভবঘুরে জীবনে নজরুল যেখানেই গেছেন সেখানেই তিনি কিছু না কিছু রচনা করেছেন। তেওতার স্মৃতি নিয়েও তিনি অনেক কবিতা গান সৃষ্টি করেছেন বলে রফিকুল ইসলামের গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে। এমনই একটি হচ্ছে নজরুলের `লিচু চোর কবিতা`। তেওতার জমিদারদের স্থানীয়ভাবে বলা হতো বাবু। আর তাদের বিশাল পুকুর ঘিরে তাল গাছ থাকায় বলা হতো তালপুকুর। প্রাচীর ডিঙিয়ে এই পুকুর পাড়ের গাছ থেকে একটি বালক লিচু চুরি করতে গিয়ে মালি ও কুকুরের তাড়া খাওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নজরুল এই কবিতাটি রচনা করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন বলে রফিকুল ইসলাম তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও তেওতা গ্রামের পাশ দিয়ে যমুনা নদীর স্মৃতিতে বেশ কিছু গান ও কবিতা লিখেছেন। যেমন নীল শাড়ি পড়ে নীল যমুনায় কে যায়। কেন প্রেম যমুনা আজি হলো অধীর। আজি দোল ফাগুনে দোল লেগেছে...বৃন্দাবনে প্রেম যমুনায়। যমুনা কুলে মধুর মধুর মুরলী সখি বাজিল। যমুনা সিনানে চলে তন্বী মরাল। চাঁপা রঙের শাড়ি আমার যমুনা নীর ভরণে গেল ভিজে।নজরুল তার `ছোট হিটলার` কবিতাতেও তেওতা গ্রামের কথা স্মরণ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের মাইলাই গ্রামটি কামানের গোলায় বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। নজরুল তাঁর দুই ছেলে সব্যসাচী (নিনি) ও অনুরুদ্ধ (সানি)র জবানিতে এই কবিতায় লিখেছেন-মা গো! আমি যুদ্ধে যাব, নিষেধ কি মা আর মানি?রাত্তিরে রোজ ঘুমের মাঝে ডাকে পোল্যান্ড, জার্মানি। ভয় করি না পোলিশদেরে জার্মানির ওই ভাঁওতাকে,কাঁপিয়ে দিতে পারি আমার মামার বাড়ি তেওতাকে।ঝাঁকড়া চুল আর মায়াবী চোখের নজরুল এক সময় গান, কবিতা, বাঁশির সুর আর দুরন্তপনায় তেওতা গ্রাম আর তেওতার মানুষকে মাতিয়ে গিয়েছেন। সে সময়কার মানুষেরা এখন আর নেই। কথা বলেতে পারলে হয়ত ধ্বংসের গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা নবরত্ন মঠটি নজরুলকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে পারতো। কিন্তু এটাতো অসম্ভব। তারপরও পূর্ব পুরুষদের মুখের কথায় নজরুল আর প্রমীলা রূপকথার মতই তেওতাবাসীর কাছে জেগে আছেন।   নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিধন্য তেওতা গ্রামে বেশ কয়েক বছর ধরে স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়। গত বছর প্রথমবারের মতো সরকারি উদ্যোগে জাতীয় নজরুল সম্মেলন করা হয় সেখানে। নজরুলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এবারে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানসূচির মধ্যে রয়েছে- সকাল ৮ টায় জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের প্রতিকৃতিতে পুস্পস্তবক অর্পণ এবং ১০ টায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। উক্ত অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড.শামসুজ্জামান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.রফিকুল্লাহ খান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আলতাফ হোসেন উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।এসএস/পিআর