বছর ঘুরে আবারো শুরু হয়েছে ইলিশ মৌসুম। সাগর ডাকছে জেলেদের। তাই জাল-দড়ি আর রসদ সামগ্রী নিয়ে সমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন উপকূলীয় জেলারা। অতীতের বছরগুলোতে জেলেরা সমুদ্রে জলদস্যুদের হামলা, লুণ্ঠন এবং মুক্তিপণ বানিজ্যে দিশেহারা থাকলেও এবার জলদস্যু দমনে সরকারের বিশেষ ভূমিকায় সাগর যাত্রা অনেকটা নিরাপদ বলে মনে করছেন মৎস্যজীবীরা। তাই অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বেড়েছে প্রান্তিক জেলের সংখ্যা।জেলে ও ট্রলার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্যৈষ্ঠের শেষে শুরু হয় ইলিশের মৌসুম। `আষাঢ় থেকে কার্তিকের শেষ’ এই পাঁচ মাস থাকে ইলিশের ভরা মৌসুম। ইলিশ মৌসুম উপলক্ষে উপকূলীয় জেলেদের মাঝে বেড়েছে কর্ম ব্যস্ততা। ব্যস্ত হয়ে পড়েছে উপকূলীয় জেলে পল্লীগুলোও। প্রতিটি ট্রলার ও জেলে পল্লীতে চলছে সাগর যাত্রার শেষ প্রস্তুতি। ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন জেলে পল্লীর নারী ও শিশুরা।জেলেদের পদচারণায় মুখরিত হতে শুরু করছে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রও। দূর-দূরান্ত থেকে পাথরঘাটায় আসতে শুরু করেছেন পাইকার ও আড়তদাররা। ব্যস্ততা বেড়েছে বরফ কলগুলোতেও। জেলে পল্লীগুলোতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির জন্য দম ফেলানর ফুরসত নেই যেন কারোই।বরগুনা জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যানুযায়ী, জেলার ৬ টি উপজেলায় মোট ২৯ হাজার ৫৪১টি জেলে পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে সদরে ৭ হাজার, আমতলী উপজেলায় ৭ হাজার ২০০, পাথরঘাটায় ৯ হাজার ৭১ জন, বামনায় ১ হাজার ১০০ ও বেতাগী উপজেলায় ৪ হাজার ১৭০টি জেলে পরিবারের বসবাস।তবে বেসরকারি সংস্থা কোডেক এর হিসাব অনুসারে, বরগুনায় জেলেদের সংখ্যা সরকারি হিসেবের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে জেলার পাথরঘাটা, আমতলী ও তালতলী এলাকা ভৌগলিক কারণেই জেলে অধ্যুষিত। এসব এলাকায় অন্তত ৪০ হাজার জেলে পরিবারের বসবাস। যারা বংশ পরম্পরায় পেশাজীবী জেলে। এসব জেলেদের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস বঙ্গোপসাগর ও স্থানীয় নদ-নদীতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ শিকার।সরেজমিনে বরগুনা সদর উপজেলার গোরাপদ্মা জেলে পল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে, কেউ ট্রলারে জাল তুলছে, কোনো কোনো ট্রলার দ্রুত মেরামত সম্পন্ন করতে চলছে মালিকের শেষ তৎপরতা। জেলেদের অনেকেই শেষবারের মতো জাল দেখে নিচ্ছেন। কাছাকাছি নদীর তীর ঘেঁষে কয়েকজন মাঝ বয়সী জেলে জাল মেরামতে ব্যস্ত। কিশোর বয়সী আরও কয়েকজন জাল টেনে ট্রলারে তুলছে।বরগুনা জেলা জেলে সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, গত মৌসুমে ইলিশের আকাল, সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও জলদস্যুদের হামলা ও অপহরণের শিকার হয়েছে উপকূলীয় জেলেরা। একদিকে সংসারের ভরণ-পোষণের ব্যর্থতা, অপরদিকে অপহরণ থেকে উদ্ধার পেতে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে অধিকাংশ জেলে। ফলে অনেকেই পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে দেনার দায়ে এলাকা ছাড়া হয়েছেন।জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা চৌধুরী বলেন, অতীতের বছরগুলোর তুলনায় এবার সাগরে জলদস্যুদের উৎপাত কম। এ কারণেই আগের বছরগুলোতে জলসদ্যুদের হামলা, লুণ্ঠন এবং মুক্তিপণে দিশেহারা জেলেরা এবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। প্রস্তুতি নিচ্ছে সাগরে যাওয়ার।গত এক বছরে র্যাব সুন্দরবনে জলদস্যুদের আস্তানায় হানা দিয়ে জলদস্যু নির্মূলে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। সমুদ্রে কোস্টগার্ডের জোরালো টহল অব্যাহত থাকায় এবং জলদস্যুদেও আটক করায় জলদস্যুরা অনেকটাই গুটিয়ে যায়।এ বিষয়ে র্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবীর জাগো নিউজকে বলেন, জলদস্যু নির্মূলে র্যাবের অব্যাহত অভিযান পরিচালনার ফলে সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় দস্যু মাস্টার বাহিনী ইতোমধ্যেই আত্মসমর্পণ করেছে। আর যেসব দস্যুবাহিনী আছে তারাও র্যাবের অভিযানের ফলে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এসব বাহিনীর অনেকেই চাচ্ছে আত্মসমর্পণ করতে। তিনি আরো বলেন, এই ইলিশ মৌসুমে সাগরে জেলেদের মৎস্য আহরণ নিরাপদ করার জন্য ইতোমধ্যেই বঙ্গোপসাগরের মেহের আলী চরে র্যাবের একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। আর সুন্দরবনের গহীনের খালগুলোতে জোরদার করা হয়েছে র্যাবের টহল। বরগুনার পুলিশ সুপার বিজয় বসাক পিপিএম জাগো নিউজকে বলেন, ইলিশ মৌসুমে জেলেদের সাগরে নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি স্থলে জলদস্যুদের সোর্সদের আটক করার জন্য পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা স্লুইজ এলাকায় একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পদ্মা স্লুইজ এলাকায় চর পদ্মা রেডক্রিসেন্ট আশ্রয় কেন্দ্রে এ ক্যাম্প স্থাপন করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের দস্যুদের সঙ্গে পদ্মা গ্রামের অধিকাংশ যুবকের সখ্যতা রয়েছে।স্থল পথে অনেকেই দস্যুদের সোর্স হিসেবেও কাজ করেন। এ অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দা ও মৎস্য পেশার সঙ্গে জড়িতদের দাবির মুখে এ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। ইতোপূর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এখানকার সাত জলদস্যু নিহত হয়েছেন। অনেকে দস্যু ও অস্ত্র মামলায় কারাগারে রয়েছে। আর এই ক্যাম্প থেকেই জলদস্যু নির্মূলের পাশাপাশি জেলেরা কোথাও জলদস্যু দ্বারা আক্রান্ত হলে এই ক্যাম্প থেকে পুলিশ তাদের অভিযান পরিচালনা করবে। এসএস/আরআইপি