ধর্ম

ইমাম তাবারি: কোরআন ও ইতিহাসের এক অমর সাধক

আহমাদ সাব্বির

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত মানুষের অনুসন্ধিৎসা, কল্পনাশক্তি ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সম্মিলিত ফসল। মানুষ অতীতকে জানার মধ্য দিয়েই বর্তমানকে বোঝে এবং ভবিষ্যতের দিশা খোঁজে। এই ইতিহাসচেতনা যখন কেবল কাহিনিনির্ভর না হয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, দলিল, সূত্র ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির আলোকে গড়ে ওঠে, তখন তা সভ্যতার এক অনন্য অর্জনে পরিণত হয়। ইসলামি ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রেও এই রূপান্তর ঘটেছে কোরআনের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে। কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী মানবজাতি একটি অভিন্ন উৎস থেকে আগত এবং ইতিহাস মূলত আল্লাহর নির্ধারিত সুন্নত বা বিধানের ধারাবাহিক প্রকাশ। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ভিত্তি করেই যারা মানবেতিহাস রচনা করেছেন, তাদের মধ্যে ইবনে জারির তাবারি (৮৩৮–৯২৩ খ্রিস্টাব্দ) সর্বশ্রেষ্ঠ ও অগ্রগণ্য।

আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির তাবারি ছিলেন জাতিতে ইরানী। তিনি জন্মগ্রহণ করেন কাম্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী পার্বত্য অঞ্চল তাবারিস্তানে, ২২৪ হিজরী বা ৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে। দারিদ্র্য ছিল তার জীবনের নিত্যসঙ্গী, কিন্তু এই দারিদ্র্য কখনোই তার জ্ঞানস্পৃহাকে দমাতে পারেনি। শৈশব থেকেই তার মধ্যে প্রবল কৌতূহল, অধ্যবসায় ও জ্ঞানলাভের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ফারসি ভাষা ও সাহিত্য এবং ইরানের ইতিহাস অধ্যয়ন করেন। কিন্তু তার জ্ঞানতৃষ্ণা তাকে থামতে দেয়নি। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রধান কেন্দ্র বাগদাদে গমন করেন।

বাগদাদে অবস্থানকালে ইমাম তাবারি আরবী ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ভূতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তবে তার মূল আকর্ষণ ছিল কোরআনের তফসির ও হাদীসশাস্ত্র। এই দুই শাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জনের জন্য তিনি মক্কা শরীফে গমন করেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রসিদ্ধ আলেমদের সাহচর্যে থেকে জ্ঞানার্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি মিসর, সিরিয়া, ইরাক ও ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। এই সফরগুলোর উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্ডিতদের সঙ্গে মতবিনিময়, জ্ঞান সংগ্রহ এবং ঐতিহাসিক তথ্য আহরণ।

তার এই জ্ঞানসাধনার পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বহুদিন তাকে অর্ধাহারে, কখনো অনাহারে দিন কাটাতে হয়েছে। এমনকি এক পর্যায়ে জীবন রক্ষার জন্য নিজের জামার হাতা বিক্রি করে রুটি সংগ্রহ করার মতো চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখিও হতে হয়েছে। এসব দুঃখ-কষ্ট সত্ত্বেও তিনি কখনো জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্যুত হননি। বরং এই ত্যাগ ও কষ্টই তার জীবনকে এক মহৎ সাধনার উদাহরণে পরিণত করেছে।

জীবনের শেষভাগে ইমাম তাবারি বাগদাদে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এখানেই তিনি তার অমর কীর্তি—বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ ও কোরআনের তাফসির রচনা করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু, সংযমী ও স্বাধীনচেতা। মত ও চিন্তার স্বাধীনতা বজায় রাখতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন মাজহাবি বিরোধের মুখোমুখি হন। হানাফী মাযহাবের অনুসারী হলেও তিনি ইতিহাসে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে মাজহাব-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। এই কারণে হাম্বলী মাজহাবের অনুসারীরা তার ওপর ক্ষুব্ধ হয় এবং তার বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা ও ফতোয়া প্রচার করে।

এই বিরোধিতা এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে, তার মৃত্যুর পরও তা থামেনি। ৩১০ হিজরী বা ৯২৩ খ্রিস্টাব্দে তার ইন্তিকালের পর হাম্বলী অনুসারীরা তার জানাজায় বাধা দেয় এবং তাকে প্রকাশ্যে দাফন করতে অস্বীকৃতি জানায়। অবশেষে তার ভক্ত ও শিষ্যরা গভীর রাতে অত্যন্ত গোপনে তার নিজ বাসভবনের এক পাশে তাকে সমাধিস্থ করেন। এই ঘটনা ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হলেও, ইমাম তাবারির স্বাধীন চিন্তা ও সাহসিকতার উজ্জ্বল প্রমাণ।

ইমাম তাবারি ইসলামের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন মূলত দুটি মহাকীর্তির জন্য—তার বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ এবং কোরআনের তাফসির। তার ইতিহাসগ্রন্থের নাম ‘আখবারুর রাসূল ওয়াল-মুলুক’, যা ‘নবী ও রাজাদের ইতিহাস’ নামে পরিচিত। এটি আরবি ভাষায় রচিত সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ বিশ্ব ইতিহাস। গ্রন্থটি কালানুক্রমিক ধারায় রচিত এবং সৃষ্টির আদিকাল থেকে শুরু করে ৩০২ হিজরী (৯১৫ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত বিশ্বের ইতিহাস এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে এই গ্রন্থটি পনের খণ্ডে পাওয়া যায়, কিন্তু পণ্ডিতদের মতে মূল গ্রন্থটি ছিল এর প্রায় দশ গুণ বৃহৎ। কথিত আছে, এটি একশ পঞ্চাশ খণ্ডে সমাপ্ত হয়েছিল, কিন্তু পাঠকদের অনাগ্রহের কারণে ইমাম তাবারি নিজেই সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রণয়ন করেন।

এই ইতিহাসগ্রন্থে ইমাম তাবারি হাদীসের ইসনাদ বা বর্ণনাসূত্রের পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তিনি ইবনে ইসহাক, আল-ওয়াকিদী, ইবনে সাদ, আল-কালবী প্রমুখ ঐতিহাসিকদের রচনা এবং মৌখিক কাহিনি নির্বিচারে সংকলন করেন। যদিও এতে তথ্যের বিশুদ্ধতা নিয়ে পরবর্তীকালে আলোচনা হয়েছে, তবুও ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তার এই প্রয়াস অতুলনীয়। তার এই পদ্ধতিই পরবর্তী মুসলিম ঐতিহাসিকদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়। ইবনুল আসীর, আল-মাসউদী, মিসকাওয়াহ, আবুল ফিদা ও যাহাবীর মতো মনীষীরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাবারির পথ অনুসরণ করেছেন।

বিশ্ব ইতিহাসচর্চায় ইমাম তাবারির মর্যাদা এত সুউচ্চ যে, পাশ্চাত্য পণ্ডিত জর্জ সার্টন তাকে মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, যেমন আল-ফারাবী দর্শনে, আল-মাসউদী ভূগোলে শ্রেষ্ঠ, তেমনি ইতিহাসে আত-তাবারির স্থান শীর্ষে।

তবে মুসলমানদের মধ্যে ইমাম তাবারির সর্বাধিক মর্যাদা তার কোরআনের তাফসিরের জন্য। তার তাফসিরগ্রন্থ ‘জামিউল বয়ান ফি তাফসিরিল কোরআন’ বর্তমানে ত্রিশ খণ্ডে প্রকাশিত। এটি হাদিসভিত্তিক তাফসির হিসেবে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য বলে বিবেচিত। তিনি কোরআনের ব্যাখ্যায় বিপুল সংখ্যক হাদিস ব্যবহার করেছেন এবং বিভিন্ন মতের তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। এই তাফসির পরবর্তী প্রায় সব বড় মুফাসসিরের জন্য মৌলিক উৎসে পরিণত হয়েছে।

ইমাম তাবারির কর্মজীবনের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো তার অধ্যবসায়। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, তিনি প্রায় চল্লিশ বছর ধরে প্রতিদিন গড়ে চল্লিশ পৃষ্ঠা করে মৌলিক রচনা করেছেন। এই অক্লান্ত শ্রম, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা তাকে মধ্যযুগের জ্ঞানসাধকদের মধ্যে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ইবনে জারির তাবারি ছিলেন ইতিহাস ও কোরআনের ভাষ্যচর্চায় এক যুগস্রষ্টা মনীষী। তিনি মানব ইতিহাসকে কোরআনের আলোকে ব্যাখ্যা করে ইতিহাসচর্চাকে একটি নৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তি দিয়েছেন। দারিদ্র্য, বিরোধিতা ও নিগ্রহের মাঝেও তিনি যে জ্ঞানসাধনা অব্যাহত রেখেছেন, তা তাকে কেবল একজন পণ্ডিত নয়, বরং এক আদর্শ সাধক ও মানবকল্যাণে নিবেদিত চিন্তাবিদ হিসেবে চিহ্নিত করে। ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে তার অবদান চিরকাল স্মরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।

ওএফএফ/এমএস