সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার প্রভাব পড়েছে পর্যটন এলাকা রাঙামাটিতেও। আর তাই এবার ঈদে আশানুরূপ পর্যটকের সাড়া মেলেনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই লীলাভূমিতে। ফলে সেখানকার পর্যটন ব্যবসায় বিপুল রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা ভেস্তে গেছে। চলছে মন্দাভাব। রাঙামাটি পর্যটন মোটেল অ্যান্ড হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবার ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাঙামাটিতে প্রচুর পর্যটক আসার সম্ভাবনা ছিল। ঈদের অনেক আগে থেকেই প্রচুর পর্যটক অগ্রিম বুকিং দিয়েছিলেন। কিন্তু গুলশানের জঙ্গি হামলার ঘটনায় অগ্রিম বুকিং বাতিল করেন পর্যটকরা। কিছু স্থানীয় লোকজন ছাড়া রাঙামাটিতে বাইরের তেমন কোনো পর্যটকের আগমন ঘটেনি এবার ঈদে। প্রতি বছর ঈদে এখানকার পর্যটন ব্যবসায় রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আয় হতো। এবারও বিপুল সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু জঙ্গি হামলার প্রভাবে সেটাতে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। এছাড়া পর্যটকের আগমন না হওয়ায় সরকারি পর্যটন কমপ্লেক্সের বাইরেও বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, মোটেল ও বিনোদন স্পটগুলোও ফাঁকা ছিল বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, বর্তমানে রাঙামাটি পর্যটন মোটেল ও হলিডে কমপ্লেক্সে দুটি মোটেল, ছয়টি কটেজ ও একটি ঝুলন্ত সেতু আছে। এছাড়া নৌ ভ্রমণের জন্য রয়েছে বোটিং ব্যবস্থা। বিনোদনের জন্য আরও পর্যাপ্ত সুবিধা সম্প্রসারণ প্রয়োজন। তবে পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এছাড়া সড়ক পথে পর্যটকরা কোথাও বেড়াতে যেতে চাইলে তাৎক্ষণিক গাড়ির ব্যবস্থাও রয়েছে। মোটেলে রয়েছে থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা। রয়েছে একটি বার। পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়িসহ সার্বক্ষণিক পুলিশি টহল জোরদার থাকে।তিনি বলেন, প্রতি ঈদে রাঙামাটিতে প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটলেও এবার মারাত্মক মন্দাভাব দেখা গেছে। ফলে এখানকার পর্যটন ব্যবসায় এবার লাভ তো দূরের কথা, লোকসান গোনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে, সদরসহ রাঙামাটি জেলাজুড়ে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় ও উপভোগ্য স্থান। গড়ে উঠেছে অনেক দৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্পট। রাঙামাটির মূল শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের হলিডে কমপ্লেক্স। সেখানে রয়েছে দৃষ্টিকাড়া ঝুলন্ত ব্রিজ, কটেজ ও মোটেল। কাপ্তাই লেকে নৌ ভ্রমণের জন্য রয়েছে স্পীডবোট, প্যাডলবোট ও ইঞ্জিনবোটের সুবিধা। শহর থেকে চার কিলোমিটার পূর্বে বালুখালীতে গড়ে উঠেছে সরকারি কৃষি বিভাগের কৃষি ফার্ম, বেসরকারি পর্যটন স্পট টুকটুক ইকোভিলেজ, পেদাটিংটিং ও চাংপাং রেস্টুরেন্ট। নদীপথে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে জেলার বরকল উপজেলার সুবলং ইউনিয়নে অবস্থিত মনোরম সুবলং ঝর্না স্পট। শহরের উত্তরে নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাটে স্থাপিত হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের স্মৃতিসৌধ। এসব স্থাপনায় যেতে হলে রিজার্ভ করে নিতে হবে স্পীডবোট অথবা ইঞ্জিনবোট। বোট নিয়ে গেলে একসঙ্গে পাহাড়, স্বচ্ছ জলধারা, নৌ ভ্রমণ, দর্শনীয় স্পট পরিদর্শনসহ অনেক কিছু উপভোগ করা যায়। জেলা সদরেই রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের উভয়পাশে সাপছড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ। মূল শহরে সংযুক্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশের প্রধান বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রাজবন বিহার। পাশে কাপ্তাই লেক পরিবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন রাজদ্বীপে অবস্থিত চাকমা রাজার বাড়ি। কাপ্তাই লেক ঘেঁষে শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মনোরম ডিসি বাংলো। পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে জেলা পুলিশের একটি বিনোদন স্পট ‘পলওয়েল’। সেখানে স্থাপিত হয়েছে ‘রাঙামাটি লাভ পয়েন্ট’ নামে আরেকটি স্পট। রাঙাপানির হেচারী এলাকায় স্থাপিত হয়েছে সুখী নীলগঞ্জ স্পট। এছাড়া বরকল, হরিণা, ঠেগামুখ সীমান্ত, মাইনি, কাচালং, সাজেক ভেলিতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বহু স্থান। রাঙামাটির প্রবেশমুখে কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়ায় রয়েছে ঠান্ডাছড়ি চা বাগান, উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র। কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায় রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম কাগজ কল কেপিএম, কাপ্তাই বাঁধ, জাতীয় উদ্যান, নেভীক্যাম্প, জুম প্যানোরমা স্পট, শিলছড়ি বনানী পর্যটন স্পট, চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার, ওয়াশা চা বাগানসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও স্থাপনা। প্রতি ঈদে এসব স্থাপনা ও স্পটে প্রচুর পর্যটকের পদচারণা ঘটলেও এবার রয়েছে ফাঁকা।এফএ/পিআর