অর্থনীতি

ঋণনির্ভরতা থেকে মালিকানাভিত্তিক অর্থনীতিতে যেতে হবে: তিতুমীর

দেশের অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে ভোগ ও ঋণনির্ভর মডেল থেকে বের হয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, অর্থনীতি যদি ভোগনির্ভর হয় এবং বিনিয়োগনির্ভর না হয়, তাহলে সেই অর্থনীতি কখনো টেকসই হতে পারে না। একইভাবে ঋণনির্ভর অর্থনীতিও টেকসই নয়। তাই আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ঋণনির্ভর সমাজ থেকে মালিকানানির্ভর সমাজে যাওয়া।

রোববার (৮ মার্চ) পুঁজিবাজার বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত ‘নতুন সরকারের জন্য শেয়ারবাজারে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. তিতুমীর বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনীতি একটি সংকটপূর্ণ অবস্থার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের ভাষায় অর্থনীতি ‘আইসিইউতে’ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকার বড় ধরনের পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে এবং জনগণও সেজন্য শক্ত ম্যান্ডেট দিয়েছে।

তিনি বলেন, নতুন সরকারের অর্থনৈতিক রূপকল্প পাঁচটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো হলো- রাষ্ট্র সংস্কার, বৈষম্য নিরসনের মাধ্যমে সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন, সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং জাতীয় সংহতি জোরদার করা।

তার মতে, এই পাঁচ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কর কাঠামোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এর জন্য বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও কর এই চার ধাপের পরীক্ষিত অর্থনৈতিক মডেল বাস্তবায়ন করতে হবে।

পুঁজিবাজার নিয়ে তিনি বলেন, দেশের পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে সাধারণ মানুষের মালিকানা ও অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বর্তমানে দেশের বাজার মূলধন মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র প্রায় ১২ শতাংশ, যা খুবই কম।

তিনি বলেন, আমরা চাই জনগণ উৎপাদন ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানে মালিক হিসেবে অংশীদার হোক। অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের অন্যতম উপায় হচ্ছে শক্তিশালী পুঁজিবাজার।

তিতুমীর বলেন, পুঁজিবাজারে মানুষের আস্থার বড় সংকট রয়েছে। অতীতে নানা কারসাজি ও অনিয়মের কারণে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়েছেন।

তার মতে, এ সংকট কাটাতে বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি। অডিটর এবং ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দায়িত্বশীলভাবে কাজ না করে, তাহলে বাজারে স্বচ্ছতা ও আস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ব্যালান্স শিট যাচাই করেন অডিটররা, মূল্যায়ন করেন অ্যাসেসররা এবং ঝুঁকি নির্ধারণ করে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে সাধারণ মানুষ পুঁজিবাজারে আস্থা পাবে না।

এ কারণে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

পুঁজিবাজারের কাঠামোগত সংস্কারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দেশের বাজারকে ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ থেকে ‘ইমার্জিং মার্কেট’-এ উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

এছাড়া বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সরকারি প্রকল্প বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে করদাতাদের টাকার ওপর নির্ভর না করে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের দিকেও যেতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ইসলামিক ফাইন্যান্সের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশে ইসলামিক স্টক এক্সচেঞ্জ গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে, যাতে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগকারীরা এখানে লেনদেন করতে পারেন।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও বিনিয়োগের বিশেষ গেটওয়ে তৈরির পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্লকচেইন ব্যবহারের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো হবে।

পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, শুধু শেয়ারের দর ওঠানামা দিয়ে শেয়ারবাজারকে বিচার করলে চলবে না। এটিকে সর্বজনের মালিকানা ও অংশগ্রহণের গভীর প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হবে।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, নতুন সরকারের উদ্যোগে পুঁজিবাজারে সংস্কার ও রূপান্তরের বড় পরিবর্তন দেখা যাবে।

সিএফএনএম সভাপতি মনির হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব রাসেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মনিরুজ্জামান। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন- বিএসইসি কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ, বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার প্রমুখ।

এমএএস/ইএ