একুশ শতকের শুরু থেকেই বিশ্ব রাজনীতির টানাপড়েন, যুদ্ধ এবং মহামারির প্রভাবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা দেখা গেছে। সম্প্রতি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর মার্কিন বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এই অস্থিতিশীলতার সবশেষ উদাহরণ। ২০০৮ সালে রেকর্ড ১৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানো থেকে শুরু করে ২০২০ সালে তেলের দাম ঋণাত্মক হয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে গত দুই দশক তেলের বাজারের জন্য ছিল এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়।
২০০৮ সালের ১১ জুলাই জ্বালানি তেলের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। এদিন অপরিশোধিত তেলের বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ১৪৭ দশমিক ৫০ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ১৪৭ দশমিক ২৭ ডলারে পৌঁছায়, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রে মজুত কমে যাওয়া, চীনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং ওপেকের সদস্য দেশ ইরান ও নাইজেরিয়ায় অস্থিরতার কারণে এই উল্লম্ফন ঘটেছিল। তবে ওই বছরের শেষদিকে বিশ্বমন্দার কবলে পড়ে দাম ৩৬ ডলারে নেমে আসে।
২০১১-২০১২: আরব বসন্ত২০১১ সালে তিউনিসিয়া, মিশর ও ইয়েমেনের ‘আরব বসন্ত’ এবং লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের প্রভাবে ব্রেন্ট ক্রুড ১২৭ ডলারে উঠে যায়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের ওপরে স্থিতিশীল ছিল। তবে ২০১৪ সালের পর মার্কিন ‘শেল অয়েল’ বাজারে আসায় দাম হু হু করে ৫০ ডলারের নিচে নেমে যায়।
২০২০: করোনা মহামারি ও ঋণাত্মক দামতেলের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটে ২০২০ সালে। করোনাভাইরাস মহামারিতে বিশ্ব স্থবির হয়ে পড়লে তেলের চাহিদা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। মজুত করার জায়গা না থাকায় ডব্লিউটিআই তেলের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাইনাসে (- ৪০ দশমিক ৩২ ডলার) নেমে যায়। অর্থাৎ, বিক্রেতারা ক্রেতাকে তেল নেওয়ার জন্য উল্টো টাকা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়। সে সময় ব্রেন্ট ক্রুড ১৩৯ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ১৩০ ডলারে পৌঁছায়। মূলত রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং করোনাত্তোর বাড়তি চাহিদাই এই দাম বৃদ্ধির মূল কারণ ছিল।
২০২৬: ইরান যুদ্ধইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এই শতকে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং মহামারির মতো ঘটনাগুলোর কারণে বিশ্ববাজারে বারবার তেলের দামে বড় ওঠানামা ঘটেছে। ইরান যুদ্ধ দ্রুত সমাপ্ত না হলে তেলের বাজার আরও চাপে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: এএফপিকেএএ/