দেশজুড়ে

কম বয়সে বিয়েটাই তার কাল হয়েছে

ইউনিয়ন পরিষদের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো সে। হালকা-পাতলা গড়ন, গায়ের রং ফর্সা। নাম খাদিজা আক্তার পপি। দেখেই বোঝা যায় বয়স খুব একটা বেশি নয়। সময়টা দৌড়ঝাপ আর হৈ-হুল্লোল করে বেড়ানোর। কিন্তু এই বয়সে শুধু বিয়েই হয়নি, মাও হয়েছে পপি। কোলজুড়ে তার ৮ মাসের কন্যা সন্তান।শুক্রবার দুপুরে মানিকগঞ্জের তেওতা ইউনিয়ন পরিষদে দেখা মেলে এই কিশোরী মায়ের। স্বামী আর শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচারে অতিষ্ট পপি ৪ মাস ধরে আছেন বাবার বাড়িতে। হেনস্তা করতেই তার বাবার বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা দিয়েছে শ্বশুর। তারই তদন্ত এসেছে ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে। এজন্যই বাবা-মায়ের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদে এসেছে পপি।যমুনার দুর্গম চরাঞ্চল বাঘুটিয়া ইউনিয়নের ব্রাম্মন্দি গ্রামের নুরাই সরদারের মেয়ে পপির ৮ বছর আগে বিয়ে হয় স্থানীয় রফিকুল ইসলাম মর্তুজের ছেলে জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তখন পপি ছিল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। বয়স ১১ বছর। এই অল্প বয়সে বিয়ে হওয়াটাই এখন কাল হয়েছে পপির জীবনে।  বিয়ের কিছুদিন না যেতেই স্বামী,শ্বশুর-শাশুড়ি শারীরিক ও মানুষিকভাবে নির্যাতন শুরু করে তাকে। দরিদ্র মা-বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে এই বয়সেই সব সহ্য করেছে পপি। কিন্তু কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার পর থেকে তার জীবনে আরো কষ্ট নেমে আছে।পপি জানায়, শ্বশুর বাড়ির লোকজনের আশা ছিল একটি পুত্র সন্তানের। কিন্তু কন্যা সন্তান হবে শোনার পর থেকেই তার উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িযে দেয় তারা। এমনকি একটি ক্লিনিকে ডাক্তারি পরীক্ষায় যখন কন্যা সন্তান হবে নিশ্চিত হয়েছিল, তখন ক্ষেপে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারি পরীক্ষার কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলেছিল তার শ্বশুর।শ্বশুর বাড়ির লোকজনের অত্যাচারে অতিষ্ট পপি চার মাস ধরে বাবার বাড়িতে অবস্থান করছে। মাঝে গ্রাম্যশালিসে সমঝোতা করে তাকে শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়েছিলে। কিন্তু সেই দিনই আবারো তাকে মারপিট করা হয়।পরে সমাজপতিরাই তাকে বাবার বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে গেছে।পপির বাবা নুরাই সরদার জানান, তার মেয়েকে না রাখতে নানা কৌশল আটছেন শ্বশুর বাড়ির লোকজন। অথচ সংসার টেকানোর জন্যই স্বামীসহ শ্বশুর বাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে কখনো আইনী পদক্ষেপ নেননি তিনি। কিন্তু পাওনা টাকার দাবিতে তার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা করেছে মেয়ের শ্বশুর।তিনি স্বীকার করেন, অল্প বয়সে মেয়েকে বিয়ে দেয়াটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত। মেয়ের ভবিষৎতকে তিনি গলাটিপে হত্যা করেছেন।পপির মামা মোন্নাফ বেপারী জানান, চারপাশের পরিবেশ এখন ভাল না। তাইতো চরাঞ্চলে অল্প বয়সেই বেশির ভাগ মেয়েদের বিয়ে দেয়া হয়। তার এই কথায় সায় দেন উপস্থিত লোকজন। তারা বলেন, একই চিত্র সবগুলো চরে।স্থানীয় বাসিন্দা মারুফ হোসেন জানান, চরের মানুষের মধ্যে শিক্ষার অভাব রয়েছে। দরিদ্র পরিবারগুলো মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ায় চরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও অনেক বেশি। বাল্যবিয়ের কারণে পারিবারিক ও সামাজিক নানা সমস্যা হচ্ছে। তাই বাল্যবিয়ে বন্ধে চরগুলোতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।বি.এম খোরশেদ/এসএস/পিআর