দিনাজপুরের হাকিমপুর সাব-রেজিস্ট্রর অফিসে ভুয়া ক্রেতা-বিক্রেতা সেজে জাল দলিল তৈরি করে অন্যের জমি বিক্রি করার চাঞ্চল্যকর খবর ফাঁস হয়েছে। এই ঘটনায় প্রকৃত জমির মালিক শামছুল হুদা বাদী হয়ে আদালতে দলিল বাতিলের মামলা করেছেন।মামলার বিবরণে জানা যায়, হাকিমপুর উপজেলার আলিহাট মৌজার জেএল নং-৩০৬ এর এস এ খতিয়ান নং-৯ ও ২১৩, দাগ নং-১৭১৮ ও ১৮৫৩ যার হালদাগ নং-৩৫৯৩ ও ৩৬০০ এর পৈতৃকসূত্রে মূল মালিক দুই ভাই আহসান পারভেজ ও শামছুল হুদা এবং তাদের মা মোছা. শেফালী বেগম। তারা এই দুই দাগে ১২৬ শতক জমির মালিক। ১২৬ শতক জমির মধ্যে ১০০ শতক জমির ভুয়া মালিক সেজে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার পবাহার গ্রামের মহসীন আলী মণ্ডরের ছেলে মঈনুল হোসেন গত ৫ মে একই উপজেলার বিনধারা সোনার পাড়া গ্রামের আব্দুল হান্নানের বিক্রি করেন। আব্দুল হান্নান ওই এলাকার তসলিম উদ্দিনের ছেলে। যার হাকিমপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দলিল নং-১০৩৪ ক্রমিক নং-১০৩৭।জমির মালিক শামছুল হুদা জানান, তিনি এবং তার মা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বসবাস করছেন। অন্যদিকে তার বড় ভাই আহসান পারভেজ পাঁচবিবিতে ভাড়া বাসায় থাকেন। আর এই সুযোগে ক্রেতা আব্দুল হান্নান কৌশলে মঈনুল হোসেনকে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে মালিক সাজিয়ে ১০০ শতক জমি নিজ নামে রেজিস্ট্রি করে নেন। পরবর্তীতে জানতে পারেন ভুয়া মালিক সেজে মঈনুল হোসেন তাদের জমি আব্দুল হান্নানের কাছে বিক্রি করেছেন। এই ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর তারা জানতে পারেন, দলিলে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তা তাদের পরিবারের কারো নয়। ছবিটি ভুয়া মালিক মঈনুল হোসেনের। এছাড়া দলিলে শুধুমাত্র শামছুল হুদাকে মালিক দেখানো হয়েছে। অথচ এই জমির মালিক তিনজন। সেখানে মালিকের স্বাক্ষর হুবহু করতে পারলেও নাম ভুল লেখা রয়েছে। ব্যবহার করা হয়নি জাতীয় পরিচয়পত্রের ক্রমিক নম্বর। ফিঙ্গার প্রিন্ট কীভাবে করা হয়েছে তা জানা নেই। দলিলটি প্রস্তুত করেছেন হাকিমপুর উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের মুহুরি নজরুল ইসলাম সনদ নং(১)। শনাক্তকারীর স্বাক্ষর করেছেন খাট্রাউছনা গ্রামের আব্বাস আলীর ছেলে জাহাঙ্গীর আলম, সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন সাতকুড়ি গ্রামের মৃত সিরাজতুল্যাহ সরকারের ছেলে মো. আবু বক্কর সিদ্দিক এবং ভুয়া বিক্রেতা মঈনুল হোসেন নিজে। তিনি আরো জানান, যখন ভুয়া দলিল প্রস্তুত করে ক্রেতা-বিক্রেতা সেজে জমিটি বিক্রি করা হয়েছে তখন হাকিমপুর সাব-রেজিস্টার অফিসের সাব-রেজিস্টারের দায়িত্বে ছিলেন মো. রজব আলী। তিনি বর্তমানে বিরল উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কর্মরত। তার সঙ্গে এই দলিলটি সম্পাদন করতে মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছেন মুহুরি আব্দুর রউফ। এই ঘটনায় গত ৭ আগস্ট দলিল বাতিলের মামলা করেছেন শামছুল হুদা। যার মামলা নং-২৭/২০১৬।শামছুল হুদা জানান, ভুয়া দলিল যারা সৃষ্টি করেছেন এবং বিক্রেতা-ক্রেতা সেজেছেন ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর উপজেলা চেয়ারম্যান আকরাম হোসেন সবাইকে তার কার্যালয়ে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তারা কেউ সেদিন আসেননি। এসময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভূমিদস্যু চক্রের কেউ প্রধান, কেউ সদস্য। শামছুল হুদা আরো জানান, মুঠোফোনে আইযুব আলী নামে এক ব্যক্তি অনবরত তাকে মামলা তুলে নেয়ার হুমকি দিয়ে আসছেন। এমনি তার বড় ভাই আহসান পারভেজের কর্মস্থল সরাইল উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়েও হুমকি দিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, মামলা তুলে নেয়া না হলে উল্টো মামলা দিয়ে তাকে ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন বলেও জানান তিনি।এ ব্যাপারে সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মো. রজব আলীর জানান, হতে পারে। কিন্তু আমার পক্ষে সবাইকে চেনা সম্ভব নয়। আদালতে গেলে যদি প্রমাণ করতে পারে, তবে দলিলটি বাতিল হয়ে যাবে। দলিলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ক্রমিক নম্বর কেন ব্যবহার করা হয়নি? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দলিলটি দেখার সময় বিষয়টি অনিচ্ছাকৃতভাবে খেয়াল করা হয়নি। আমরা সাব-রেজিস্ট্রাররা বিপদে আছি।এমদাদুল হক মিলন/এআরএ/এবিএস