দেশজুড়ে

বগুড়ায় চামড়ার বাজারে ধস : মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত

এবার বগুড়ায় কুরবানির ঈদে চামড়ার বাজারের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। বিগত ১০ বছরের তুলনায় বাজারে চামড়ার দাম ছিল একেবারেই কম। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও ঢাকার ট্যানারি মালিকদের বেধে দেয়া দামের অযুহাতে মাঠ পর্যায়ে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা স্বল্পমূল্যে চামড়া কিনে নিয়েছে। তবে তারা আবার মহাজনের ঘরে উচ্চমূল্যেই সেই চামড়া বিক্রি করেছে। চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, মূলধন সংকটের কারণে এবারো বড় ব্যবসায়ীদের মাঝে তেমন উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল না। ঢাকার অধিকাংশ ট্যানারি মালিকের কাছে বছরের পর বছর তাদের বিপুল অঙ্কের টাকা বকেয়া পড়ে থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন তারা। জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন সরকার জানান, ঢাকায় ট্যানারি স্থানান্তর, জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের প্রায় ১০ কোটি টাকা বিভিন্ন ট্যানারি মালিকের কাছে আটকে রাখা এবং লবণের বাজারে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোই এবার চামড়ার বাজার এলোমেলো হয়েছে। তবে তারপরেও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে স্থানীয় মহাজনরা তুলনামূলক বেশি দামে চামড়া কিনেছেন। মাঠ পর্যায়ে বাজার ধসের জন্য ফড়িয়া সিন্ডিকেটরাই দায়ী।মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিবছরই কুরবানির ঈদে বগুড়ার চামড়া ব্যবসায়ী মহাজনদের পাশাপাশি ফড়িয়া ও ক্ষুদ্র ববসায়ীরাও চামড়া কিনে থাকেন। জেলা থেকে প্রতিবছর কুরবানির প্রায় দুই লাখ গরু এবং এক লাখ ছাগলের চামড়া ঢাকার ট্যানারিগুলোতে সরবরাহ করা হয়। প্রতিবছরের মতো এবারো ঈদের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার বাইরের চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দেয় ট্যানারি মালিকসহ চামড়া শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংগঠনগুলো। সেই বেধে দেয়া দামের কারণে ঈদের সকাল থেকেই বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় এবং গ্রামাঞ্চলে কমদামে চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে যেভাবে কম দামে চামড়া কিনেছে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা, শহর পর্যায়ে তার চেয়ে আরো কম দামে চামড়া কেনাবেচা হয়েছে। একটি গরুর চামড়া সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকায় কেনা হয়। আর ছাগলের চামড়ার দাম ছিল সর্বোচ্চ ৫০ টাকা। কিন্তু মহাজনরা ফড়িয়াদের কাছে থেকে গড়ে একটি গরুর চামড়া কিনেছেন ১৮শ থেকে ২৫শ টাকায়। অর্থাৎ মাঝের এই টাকা গেছে এই সিন্ডিকেটের পকেটে।বগুড়ায় চামড়ার বাজারখ্যাত বাদুড়তলা, চকসুত্রাপুর ও চকযাদু রোডের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ঢাকার ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বগুড়ায় চামড়া কেনাবেচা হয়েছে বেশি দামে। বগুড়া বাজারে এবার কুরবানির পশুর চামড়া গরু প্রতি বর্গফুট ৮০ থেকে ৯০ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ২৫ থেকে ৩৫ টাকা দরে বেচাকেনা হয়েছে। চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির একটি সূত্র জানান, ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগই কুরবানি ঈদের আগে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিয়ে চামড়া কিনেন। তারা আশায় থাকেন ট্যানারি মালিক বা আড়তদারের কাছে চামড়া বিক্রির টাকা পেয়ে ঋণ পরিশোধ করেন। কিন্তু ট্যানারি মালিকরা টাকা দিতে বিলম্ব করেন। অনেকে আবার বছরের পর বছর টাকা পরিশোধ না করে ব্যবসা করতে বাধ্য করে। ফলে বিপাকে পড়তে হয় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। তিনি বলেন, গত বছর বগুড়ার বাজার থেকে যে চামড়া ট্যানারি মালিকরা নিয়েছেন, সেই টাকাটা এখনো শোধ করা হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীদের মাথার ওপরে এখন অনেক ঋণের বোঝা। এই অবস্থায় ব্যাংক ঋণও নিতে পারেননি অনেক ব্যবসায়ী। এদিকে, স্থানীয়ভাবে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণের যে প্রক্রিয়া সেটিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও লবণের উচ্চমূল্যের কারণে। চামড়া ব্যবসায়ী নূরুল ইসলাম জানান, গত বছর কুরবানির আগে প্রতি বস্তা (৭৩ কেজি) লবণের দাম ছিল ৮৫০ থেকে ৮৮০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে প্রতি বস্তা লবণের দাম ১৪০০ থেকে ১৪৫০ টাকা। লবণের দামের সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরিও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ঈদের দিন চামড়া কেনার পর সেগুলোকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে গরুর প্রতিটি চামড়ায় গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি খরচ হয় (লবণ দেয়া ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ)। এর সঙ্গে আরো যোগ হয় পরিবহন খরচ ও ব্যাংক ঋণের সুদ। ফলে প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীরা লোকসানে মুখে পড়ছে। আগে যেখানে ১২ হাজার টাকায় ট্রাক ঢাকায় পাঠানো যেতো এখন সেখানে নেয়া হচ্ছে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা।এআরএ/এমএস