দেশজুড়ে

জীবিত কবির চেয়ে মৃত কবি যেন অনেক শক্তিশালী

জন্মভূমির টানেই কুড়িগ্রামে ফিরে এলেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। শায়িত হলেন তার প্রিয় জন্মভূমির কোলে। তার প্রিয় জলেশ্বরীর বুকে। যেন শান্তির ঘুম। ঘুমাও কবি ঘুমাও। শান্তিতে ঘুমাও। না ফেরার দেশের এ চিরনিদ্রা দেখতে হাজার-লাখো মানুষের ভিড়। জীবিত কবির চেয়ে আজ মৃত কবি যেন অনেক শক্তিশালী। অনেক জনপ্রিয়। সবার প্রাণের মানুষ। বুধবার শেষ বিকেলে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠ কানায় কানায় ভরা ছিল লাখো মানুষ দিয়ে। যেমনটি ভরা ছিল গত বছর ১৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায়। সেদিন এ কবি ছিলেন তার সফর সঙ্গি। বিকেল সাড়ে ৪টায় মরহুমের নামাজের জানাজা শেষে কলেজ মাঠের শেষ প্রান্তে ৫টার দিকে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে সমাহিত করা হয়। এর আগে বিকেল ৪টায় সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর, সাবেকমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, কবিপত্নি আনোয়ারা সৈয়দ হক, একমাত্র ছেলে তুর্জোসহ নিকট আত্মীয়রা হেলিকপ্টারে করে লাশ নিয়ে কলেজ মাঠে অবতরণ করেন। লাশ রাখা হয় একটি মঞ্চে। সবার আগে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পুস্পমাল্য অপর্ণ করা হয়। এরপর জেলা পরিষদ প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, কুড়িগ্রাম পৌরসভা, জেলা জাজশীপ ও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রট আদালত, মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো একে একে পুস্পমাল্য অর্পণ করে। কবির কফিন ফুলে ফুলে ভেসে যায়। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসে রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারী জেলার শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাহিত্যমনা মানুষ। এ যেন ছিল এক মিলন মেলা। কবির জন্ম কুড়িগ্রাম শহরের থানাপাড়ায়। তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সময় ৯ম শ্রেণিতে ওঠার পর ঢাকায় চলে যান। যিনি তার জীবনের অধিকাংশ লেখায় কুড়িগ্রামকে তুলে এনেছেন। কুড়িগ্রামকে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। তার শেষ ইচ্ছা বাস্তবায়নে কুড়িগ্রামে সমাহিত করা হয়।যে সজনে গাছে লাল রঙের পাখি দেখে কবি এগার বছরেই কবিতা লিখেছিলেন। সেই কবিতা লাল পাখির মতো ডানা মেলে তাকে নিয়ে গেছে সাহিত্যের সব ক্ষেত্রেই। তিনি বিচরণ করেছেন সংস্কৃতির প্রতিটি পরতে পরতে। তার পায়ের আওয়াজে মুগ্ধ হয়ে গেছেন সাহিত্য প্রেমিরা। ব্রিটিশ বিরোধী নুরলদীনকে তিনি চিনিয়েছেন কাছ থেকে। তার জলেশ্বরী কুড়িগ্রামকে স্থান করে দিয়েছে সাহিত্যাঙ্গনে। এই সব্যসাচী লেখক সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেও তার অমর গাঁথা তাকে বেঁচে রাখবে চিরদিন। বুধবার তার মরদেহ কুড়িগ্রামে আসবে শুনে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন ছুটে এসেছেন তাকে এক নজর দেখার জন্য। রাত থেকেই কর্মযজ্ঞ চলছিল। চারদিকে ঘিরে কৌতুহলী মানুষ তার সম্পর্কে জানতে চাইছিল অনেক কিছুই। শহর জুড়ে চলছিল মাইকিং। সাধারণ মানুষ কবিকে ঘিরে করছেন নানান প্রশ্ন। কৈশরে কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর অববাহিকায় বেড়ে ওঠা এই মানুষটি তার স্বপ্নের জলেশ্বরী নদীর মাধ্যমে ভীষণভাবে খুঁজে পায় উত্তরের রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন পটভূমিকে। ইতিহাস ও সংস্কৃতির ইতিবৃত্ত। কবির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ প্রাঙ্গনে বিকেলে দাফন করা হয়। তার ইচ্ছার মর্যাদা দেওয়ায় কবি ১১ মার্চ ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে লিখে গেছেন, ‘আমার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে আপনারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, এতে আমি আনন্দিত এবং আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার জন্মস্থান আমার শেষ ঘর হবে। এটাযে আমার বহু দিনের ইচ্ছা এবং আমার পরিবার পরিজন সে ভাবে প্রস্তুত। তারাও আপনাদের সিদ্ধান্তে আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ। আমার স্বশ্রদ্ধ সালাম রইল।’কবি পুত্র তুর্জো মরহুমের নামাজে জানাজার আগে বলেন, জলেশ্বরী আজ তোমার ছেলে তোমাকে ফিরে এনেছে তোমার কাছে। হৃদয়ের কাছে। ভালোবাসার কাছে। প্রিয় জন্মভূমির কাছে। আমি গর্বিত। এক সঙ্গে গর্বে বুক ফেটে যায় এত মানুষের ভালোবাসা দেখে। প্রধানমন্ত্রী ও সংস্কৃতি মন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তার বাবার শেষ ইচ্ছা পূরণে সহায়তা করবার জন্য। সেই সঙ্গে কুড়িগ্রামবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমার বাবা খুব খুশি হয়েছে এ মাটিতে শায়িত হতে পেরে। কুড়িগ্রাম সবুজ পাড়ায় অবস্থিত সৈয়দ হকের ছোট ভাইয়ের সহপাঠি গৃহসংস্থান অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত এস্টিমেটর আবুল ফজল মন্ডল জানান, সৈয়দ শামসুল হক যখন কুড়িগ্রামে পড়তেন, তখন রিভারভিউ স্কুল নাম ছিল না। বর্তমানে প্রগতি সংসদ সংলগ্ন জেলা শিল্পকলা একাডেমির ভবনের জন্য নির্ধাতির স্থানের পাশেই ছিল এম ই স্কুল (মিডিল ইংলিশ স্কুল) যা ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত ছিল। পাশেই ছিল এইচ ই স্কুল (হাই ইংলিশ স্কুল)। যা ৭ম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছিল। সৈয়দ হক তখন আমাদের সঙ্গে এই দুটি স্কুলে পড়তেন। পরে সরকার হাই ইংলিশ স্কুলটি সরকারিকরণ করে। নদী ভাঙনের সম্ভাবনা থাকায় সেটি বর্তমান রিভারভিউ স্কুলে স্থানান্তরিত করে নামকরণ পাল্টে ফেলা হয়। সৈয়দ হকের বাড়িতে আমি প্রায়ই যেতাম। তাদের বসতবাড়িতে ছিল হোমিও প্যাথিক রিসার্চ সেন্টার। তিনি চুপচাপ থাকতে পছন্দ করলেও, দুরন্তপনাও করতেন। আমরা যখন ১৯৫৪ সালে এইচ,ই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করি, তখন তিনি ঢাকার বাসা লক্ষিপুরে চলে যান। সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুতে তার প্রিয় রিভার ভিউ স্কুলে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সঙ্গে স্কুলে ছুটি ঘোষণা। নিরবতা পালন, দোয়া মোনাজাত করা হয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, সৈয়দ শামসুল হক এ বিদ্যালয়ের ছাত্র হওযায় আমরা সবাই গৌরবান্নিত। তার পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। তিনি গত বছর এ বিদ্যালয়ের শতবাষির্কী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। বিদ্যালয়ের মাটি নিয়ে কপালে ছোয়ান। এতেই বোঝা গেছে কুড়িগ্রামের প্রতি ও স্কুলের প্রতি তার ভালোবাসা কেমন। তিনি প্রথম শ্রেণি থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত এখানে পড়াশুনা করেন।নাজমুল/এমএএস/এবিএস