দেশজুড়ে

কিশোরগঞ্জে বরইতলা গণহত্যা দিবস আজ

স্মৃতির মিনারে আঁকা আছে দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়া বাবা শহীদ সৈয়দ হোসেনের নাম। তাইতো প্রতি বছর এ সময়টাতে বরইতলা স্মৃতিসৌধে ছুটে আসেন দামপাড়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম আঙ্গুর। খানিকটা চোখের জল ফেলেন নিরবে। নিজের চোখে দেখেছেন, বাবা, ভাই ছাড়াও শত শত মানুষের মৃতদেহ। নিজে বেঁচে গেলেও আজও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সেই দুঃসহ স্মৃতি।স্মৃতিসৌধে খোদাই করে রাখা বাবার নামটি দেখিয়ে শফিকুল এ প্রতিবেদককে বলেন, এই যে ৭৮ নাম্বার নামটি দেখছেন তিনি আমার বাবা। আমার চোখের সামনে তাকে হত্যা করা হয়। আমি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছি। কিন্তু আজও বাবার হত্যাকারীর বিচার পাইনি। বরং বরইতলা হত্যাকাণ্ডে জড়িত রাজাকারদের সন্তানরা সরকারি চাকরি পায়। তারা এখনো বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তখন আর নিজের বেঁচে থাকাটা সার্থক মনে হয়না।শফিকুলের মতো কিশোরগঞ্জের যশোদল ও আশপাশের এলাকার শত শত স্বজনের রক্ত মিশে আছে বরইতলা স্মৃতি সৌধে।  একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়নি আজো। বরইতলা হত্যাকাণ্ডে স্বজন হারা শত শত পরিবার বর্তমানে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। তাদের খবর রাখেনা কেউ। এখনও মিলেনি শহীদ পরিবারের মর্যাদা। দামপাড়া গ্রামের প্রবীন স্কুল শিক্ষক মো. আব্দুল আজিজ জানান, সেদিন মনে হয়েছিল পুরো এলাকায় কেয়ামত নেমে এসেছে। দাফন করার মতো অবস্থা ছিলনা। তাই নিজের হাতে অনেক মরদেহ সামনের নরসুন্দা নদীতে ভাসিয়ে দেই। একই এলাকার ৯৫ বছরের সিরাজুল ইসলাম বলেন, আখ ক্ষেত থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায় রাজাকাররা। বরইতলায় সবাইকে হত্যা করার আগেই তিনি জ্ঞান হারান। পরে অনেক মরদেহের ভেতর থেকে তাকে মৃতপ্রায় অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। মনে হয়েছিল আমি মরেই গেছি। এখনও বেঁচে আছি বিশ্বাস হয়না। ১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বরইতলা নামক স্থানে ৩শ ৬৫ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও এ দেশীয় রাজাকাররা। সেদিনের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিলো আশপাশের কয়েকটি গ্রামের নিরাপরাধ মানুষ। সৌভাগ্যক্রমে এখনও বেঁচে আছেন অনেকে। অনেকে আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন নৃশংস নির্যাতনের চিহ্ন। ১৯৭১ সনের উত্তাল অক্টোবর। দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার জন্য বাঙালি দামাল ছেলেরা জীবন বাজি রেখে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে। পাক হানাদার বাহিনী ও এ দেশের স্বাধীনতার বিরোধী রাজাকার, আল বদর সারাদেশে নির্বিচারে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ চালাচ্ছে। ১৩ অক্টোবর সকালে ট্রেনে করে ১৫-২০ জন পাক সেনা ও বিপুল সংখ্যক রাজাকার যশোদল ইউনিয়নের বরইতলা নামক স্থানে এসে নামে। তারা দামপাড়া গ্রামে প্রবেশ করে ৪-৫ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। জ্বালিয়ে দিতে থাকে গ্রামের পর গ্রাম। প্রাণে বাঁচতে কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের দামপাড়াসহ কড়িয়াইল, তিলকনাথপুর, গোবিন্দপুর, চিকনিরচর, কালিকাবাড়ি, ভুবিরচরসহ আশপাশের গ্রামের লোকজন নরসুন্দা নদীর বাঁকে একটি আঁখ ক্ষেতে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেখান থেকে রাজাকার ও পাক সেনারা তাদের ধরে এনে বরইতলা এলাকায় রেল লাইনের পাশে জড়ো করে। নিরাপরাধ গ্রামবাসীকে এক সঙ্গে জড়ো করে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। এক সময় স্থানীয় এক রাজাকার পাকবাহিনীর কাছে এসে খবর দেয়, গ্রামবাসী একজন পাক সেনাকে হত্যা করে মরদেহ গুম করে ফেলেছে। এ গুজবের কথা শুনে সত্যতা যাচাই না করেই পাক মিলিশিয়া হিংস্রতায় মেতে ওঠে। বর্বর পাক মিলিশিয়া ও তাদের আজ্ঞাবহ রাজাকার বাহিনী জড়ো করা নিরীহ গ্রামবাসীকে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেললাইনের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, লোহার রড এবং রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডে ৩শ ৬৫ জন প্রাণ হারান।বরইতলায় শহীদ হওয়া ৩শ ৬৫ জনের মধ্যে সবার নাম পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ‘কিশোরগঞ্জের ইতিহাস’ ও জাহাঙ্গীর আলম জাহান রচিত ‘রক্তে ভেজা কিশোরগঞ্জ’ গ্রন্থে ১শ ৪৭ জন শহীদের নাম, ঠিকানা উল্লেখ থাকলেও এই তালিকা নিয়ে সংশয় আছে। স্বাধীনতার পর এলাকাবাসী বরইতলার নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ নগর’ নাম রাখে। স্থানীয় অধিবাসীদের উদ্যোগে নির্মিত হয় একটি স্মৃতিফলক। পরে ২০০০ সালে বরইতলা রেললাইনের পাশে ৬শ ৬৭ বর্গফুট এলাকায় ২৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর স্মৃতিসৌধের শুকনো ইট ভিজে যায় শত শত স্বজনহারার চোখের জলে। শহীদদের নিকটাত্মীয় ও এলাকাবাসী শহীদ দিবসে ফুলের তোড়া দিয়ে শ্রদ্ধা জানান শহীদদের প্রতি। স্থানীয় ভাবে আয়োজন করা হয় আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। তবে স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার-আলবদরদের বিচার হবে বাংলার মাটিতে- এ আশা নিয়েই বেঁচে আছেন শহীদের স্বজনেরা। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. আসাদ উল্লাহ জানান, এখনও নিহতদের পরিবারের পক্ষে কেউ মামলা করতে এগিয়ে আসছে না। তাই মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে মামলা দায়ের করা যায় কিনা, সেটি চিন্তা করছি।নূর মোহাম্মদ/এফএ/পিআর