আর্সেনিকের ভয়াবহতা উপেক্ষা করেই চলছে টাঙ্গাইলবাসীর জনজীবন। ঘনবসতিপূর্ণ এ জেলাবাসীর দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় পানির অধিকাংশ চাহিদাই পূরণ হচ্ছে নলকূপ থেকে। তবে পর্যাপ্ত নলকূপ থাকলেও এতে নেই আর্সেনিকযুক্ত বা মুক্ত সঙ্কেত। ভূগর্ভ বা গভীর-অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে এই আর্সেনিক। আর্সেনিকে রয়েছে নীরব ঘাতক আর্সোনিকোসিস, যা চিকিৎসা শাস্ত্র নিশ্চিত করেছে। প্রতি লিটার পানিতে ৫০ মিলিগ্রাম বা এর বেশি পরিমাণ আর্সেনিক থাকলে তা খাওয়ার অনুপযোগী হিসেবে এ শাস্ত্রে বিবেচিত হয়। জানা যায়, নব্বইয়ের দশকে দেশব্যাপী আর্সেনিক জরিপের অংশ হিসেবে টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলার মধ্যে পাঁচটি উপজেলায় আর্সেনিক জরিপের কাজ করা হয়। এ সময় আর্সেনিক নিয়ে সরকারি বেসরকারি নানা উদ্যোগ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। দায়সাড়াভাবে কিছু নলকূপে লাল দাগ দিয়ে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে কর্তৃপক্ষ। আর্সেনিকযুক্ত নলকূপে লাল আর আর্সেনিকমুক্ত নলকূপে সবুজ সঙ্কেত দিলেও দীর্ঘদিনে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় নলকূপ থেকে মুছে গেছে ভয়াবহ সেই আর্সেনিকের লাল-সবুজের সঙ্কেত। ফলে সাধারণ মানুষ এখন অনায়াশে যেকোনো নলকূপের পানি পান করছে। বাছাই করার সুযোগ নেই কোন নলকূপটি আর্সেনিকযুক্ত আর কোনটি মুক্ত।জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে আর্সেনিক প্রকল্পের মাধ্যমে জেলার পাঁচটি উপজেলার শতভাগ টিউবওয়েলে আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়। বাকি সাতটি উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা করা হয়নি। যে পাঁচটি উপজেলার আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়েছে তার প্রতিবেদনে দেখা যায় জেলার পাঁচটি উপজেলার ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭৪১টি নলকূপের পানি পরীক্ষা করে ১৮ হাজার ৬২৯টি নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া যায়।জেলাবাসীর অভিযোগ, মানুষের সুস্থতা আর নিরাপদ বসবাস নিয়ে এ দেশের সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থার নেই মাথাব্যথা। ২০০৩ সালের পর জেলার নতুন কোনো নলকূপের পানি পরীক্ষা করা হয়নি। আর্সেনিক আছে বা নেই তা না জেনেই পান করতে হচ্ছে যেকোনো নলকূপের পানি। সরকারি বা বেসরকারিভাবে আর্সেনিক পরীক্ষায় নতুন কোনো উদ্যোগও চোখে পড়েনি। এছাড়া সেসময় যেসব নলকূপে লাল রং দিয়ে ব্যবহারে নিষিদ্ধ করা হয় সেগুলোর আর কোথাও লাল রং চোখে পড়ে না। ফলে আর্সেনিকযুক্ত নলকূপের পানি পান করে ভবিষ্যতে আর্সেনিকের ভয়াবহ বিস্তার লাভ করবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।ওই সময়ে আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়েছিল জেলার দেলদুয়ার উপজেলাতেও। উপজেলার মঙ্গলহোড় গ্রামের মহর আলী, মীর ইয়াকুব আলী, সাঈদ মিয়া, তাইজুদ্দিন, কালু মিয়া ও মো. সেলিম মিয়ার বাড়ির নলকূপে আর্সেনিক পাওয়ায় লাল রং করা হয় নলকূপগুলোতে। এ বিষয়ে সেলিম ও ইয়াকুব বলেন, বাড়ির নলকূপ দুটি নিজ খরচে উঠিয়ে নতুন জায়গায় স্থাপন করেছি। তবে পুনরায় পরীক্ষা করা হয়ে উঠেনি নলকূপ দুটির পানি। অন্যরা আগের মতোই আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। মহর আলী বলেন, অনেক আগে আর্সেনিক পরীক্ষা করে তার নলকূপে লাল রং করা হয়েছিল। কিন্তু পানি পান করে কোনো অসুবিধা না হওয়ায় এখন পর্যন্ত নলকূপটি আর সরানো হয়নি।তৎকালীন সময়ে আর্সেনিক পরীক্ষা প্রকল্পের দেলদুয়ার উপজেলার একটি ব্লকের সুপারভাইজার হালিম চৌধুরী বলেন, আমাদের দায়িত্ব ছিল আর্সেনিকযুক্ত নলকূপ বাছাই করে লাল রং দিয়ে চিহ্নিত করা। এর পরে আর কোনো প্রকল্পে আমাদের ডাক পড়েনি। বাছাই করা নলকূপের জন্য কোনো পদক্ষেপও নিতে দেখিনি।টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ (সদ্য বদলী) ডা. আব্দুল্লাহ আল রতন বলেন, আর্সেনিক আক্রান্ত রোগটি দীর্ঘস্থায়ী। প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রামের অধিক পরিমাণ আর্সেনিক মিশ্রিত পানি দীর্ঘদিন পান করলে এ রোগ হতে পারে। এছাড়া পানি পান করার সঙ্গে সঙ্গে রোগের উপসর্গ না হয়ে দীর্ঘদিন পরেও শরীরে এ রোগের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আর্সেনিকে আক্রান্ত হলে চর্মরোগ থেকে শুরু করে মরণব্যাধি ক্যান্সারও হতে পারে। আর্সেনিক থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার প্রধান উপায় আর্সেনিকযুক্ত পানি পান না করা।এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আলী আজগর জানান, আমি ছয় মাস ধরে টাঙ্গাইলে এসেছি। নিষিদ্ধ লাল রং করা নলকূপের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না আমার জানা নেই। তবে নলকূপগুলো ১০০ ফুট গভীরে স্থাপন করলে আর্সেনিক থাকে না। বর্তমানে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, নতুন নলকূপ স্থাপনের সময় অবশ্যই নলকূপের পানি পরীক্ষা করে নিতে হবে। অনেকেই পরীক্ষা করে নিচ্ছে। এই জেলার মানুষের সুপেয় পানি নিশ্চিত করার জন্য এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ ল্যাব প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। এদিকে, নলকূপের পানি পরীক্ষার যে সুযোগ রয়েছে সেটা জানেনা অনেকেই। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ না জেনেই পান করছে আর্সেনিকযুক্ত পানি। সরকারের পক্ষ থেকে নলকূপের পানির আর্সেনিক পরীক্ষার পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিশুদ্ধ পানি পানের সুযোগ দেয়ার দাবি স্থানীয় সাধারণ মানুষের।এফএ/এমএস