দেশজুড়ে

বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্প

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। সরকারি সহয়তা পেলে এ শিল্প আবারাে ঘুরে দাঁড়াবে এমনই দাবি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের।চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের উপকণ্ঠে আজাইপুর, আরামবাগ, শঙ্করবাটি ও রামকৃষ্টপুর গ্রামের মানুষের এক সময় ঘুম ভাঙতো হাতুড়ির শব্দে। ভোর থেকে সারাদিন কর্মব্যস্ত থাকতো ওই এলাকার কয়েক হাজার মানুষ। কোনো কারখানায় তৈরি হতো পিতলের কলস আবার কোথাও কাঁসার বাটি, কোনোটিতে থালাসহ কাঁসা পিতলের বিভিন্ন আসবাবপত্র ও ঘর সাজানোর অনেক জিনিস। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভারত বর্ষের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত হতো চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাঁসা পিতলের জিনিস। কিন্তু এ শিল্পের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও প্লাস্টিক, মেলামাইন, সিরামিক এবং স্টিলের জিনিসপত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এর চাহিদা কমে গেছে। এছাড়াও মজুরি কম হওয়ার কারণে নতুন করে আগ্রহী হচ্ছে না এর কারিগররা।চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার শঙ্করবাটি মহল্লার কারিগর শহীদ আলী (৬৫) জানান, ১৩ বছর বয়স থেকে তিনি কাঁসার বাটি তৈরি করছেন। এখন কাঁসার তৈরি জিনিসের চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে কাজ কমে গেছে। তাই তার সন্তানরা এখন এসব কাজ না শিখে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। আজাইপুর মহল্লার এন্তাজ আলী (৬৫) জানান, কাঁসা পিতলের কাজে শারীরিক পরিশ্রম খুব বেশি সে তুলনায় মজুরি কম। বাপ দাদার পেশা হওয়ার কারণে এখনও ছাড়তে পারছেন না।কারখানা মালিক রামকৃষ্টপুর মহল্লার আমিনুল ইসলাম জানান, কাঁসার বাসন তৈরিতে ব্যবহৃত রাং ও তামার দাম কয়েকগুন বেড়ে যাওয়ায় কাঁসা-পিতলের তৈরি জিনিসের দামও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে এর ব্যবহার ও বিক্রি কমে যাচ্ছে। এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে কাঁচামাল রাং ও তামা সহজ শর্তে আমদানিতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।অপর কারখানা মালিক নূর আমিন জানান, কাঁসা-পিতলের বাসন তৈরি করতে যে কাঁচামাল ব্যবহৃত হয় সেগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আনতে হয়। কিন্তু রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হয়রানির কারণে অনেক কারখানা মালিক সেগুলো আনছেন না। ফলে দিন দিন কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও কারিগরের অভাব ও হাতে তৈরি করতে সময় বেশি লাগায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এসব জিনিসপত্র তৈরি করার জন্য এখন আধুনিক যন্ত্র পাওয়া যাচ্ছে। সরকার যদি বিদেশ থেকে ওইসব মেশিন আমদানি করতে সহযোগিতা করে তাহলে কাঁসা ও তামার জিনিসপত্র তৈরিতে খরচ কমে যাবে এবং ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতার ভিতরে আসলে চাহিদাও বেড়ে যাবে।চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের উপকণ্ঠে আজাইপুর, আরামবাগ, শঙ্করবাটিসহ ওই এলাকার প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ এক সময় কাঁসা শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ওই এলাকা থেকে তৈরি কাঁসা পিতলের জিনিসপত্র বাংলাদেশসহ ভারত বর্ষের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত হতো।স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন সময়ে এ শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল অবৈধ পথে ভারতে চলে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। ফলে ধীরে ধীরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এখন যে কয়েকটা কারখানা চালু রয়েছে সেগুলো ধুঁকে ধুঁকে চলছে।তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতল শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রয়োজনীয় মেশিনপত্র সরবরাহ ও আর্থিক সহযোগিতা দরকার। এফএ/পিআর