দেশজুড়ে

শান্ত নাসিরনগর, তবুও আতঙ্ক কাটছে না

ফেসবুকে পবিত্র কাবা শরীফ নিয়ে ব্যাঙ্গচিত্র করে পোস্ট দেয়ার অভিযোগে গ্রেফতার রসরাজ দাসের (৩০) ফাঁসির দাবিতে রোববার চালানো তাণ্ডবের পর এখন পুরোপুরি শান্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা। তবে কিছুতেই যেন আতঙ্ক কাটছে না ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। যদি পুলিশ তৎপর থাকতো তাহলে হয়তো এই তাণ্ডবের ঘটনা ঘটতো না। তবে ঘটনা তদন্তে ইতোমধ্যে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। পরিস্থিতি বিবেচনায় নাসিরনগরে পুলিশের পাশাপাশি এখনো বিজিবি, র্যাব ও এপিবিএন মোতায়েন রয়েছে। নাসিরনগরে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে স্থানীয়দের নিয়ে সোমবার বিকেলে শান্তি ও সম্প্রীতি সমাবেশ করেছে প্রশাসন।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শনিবার পবিত্র কাবা শরীফের উপর শিবমূর্তি বসিয়ে একটি পোস্ট দেন উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের ছেলে রসরাজ দাস (৩০)। পোস্টটি মানুষের চোখে পড়লে পুলিশ রসরাজকে আটক করে। এ ঘটনায় ওইদিনই রসরাজের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে মামলা দায়ের করা হয়।রসরাজের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো নাসিরনগর উপজেলা। প্রথমে স্থানীয়রা রজসাসের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করলেও পরবর্তীতে হেফাজতে ইসলাম ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জাম-আত ওই বিক্ষোভে যুক্ত হয়। রোববার সকালে আহলে সুন্নাত ওয়াল জাম-আত ও হেফাজতে ইসলাম উপজেলা সদরের আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় খেলার মাঠে ও কলেজ মোড়ে পৃথক দুটি সমাবেশ আহ্বান করে। সমাবেশ থেকেই টুপি-পাঞ্জাবি ও গেঞ্জি পরা শত শত লোক প্রথমে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দত্তবাড়ির কালিমূর্তি ভাঙচুর করে। এসময় তারা দত্তবাড়ির লোকজনের উপরও হামলার চেষ্টা করে। এরপর দফা দফায় হামলাকারীরা উপজেলা সদরের অন্তত ১০টি মন্দিরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। এছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত শতাধিক ঘর-বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটা চালানো হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দত্তপাড়া, কাশিপাড়া, নমসূত্রপাড়া, ঘোষপাড়া ও গাঙকলপাড়ার ঘর-বাড়িগুলো।ক্ষতিগ্রস্ত দত্ত বাড়ির গৃহবধূ নীলিমা দত্ত জাগো নিউজকে বলেন, রোববার দুপুরের কিছু সময় আগে লাঠি-সোটা নিয়ে কয়েকশ টুপি-গেঞ্জি পড়া লোক অতর্কিতভাবে আমাদের বাড়ির কালিমূর্তি ভাঙচুর করে। মূর্তি ভাঙচুরের পর তারা আমাদের উপর হামলার চেষ্টা করলে আমাদের প্রতিবেশী কয়েকজন মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক রক্ষা করেন আমাদের। তবে পুলিশ যদি তৎপর থাকতো তাহলে এতো বড় হামলার ঘটনা ঘটতো না।দত্তপাড়া এলাকার বাসিন্দা রিপন দত্ত জাগো নিউজকে বলেন, হামলা চলাকালে পুলিশের ভূমিকা ছিল একেবারেই নীরব। যদি পুলিশ হামলার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে আসতো তাহলে এই ঘটনা ঘটতো না। আমরা এ ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করছি।নাসিরনগর থানা ভবন থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরত্বের হিন্দু অধ্যুসিত এলাকা কাশিপাড়া এলাকার বেশ কয়েটি মূর্তি ও ঘর-বাড়ি ভাঙচুর করা হয়।কাশিপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও হামলার শিকার পূর্ণিমা দাস জাগো নিউজকে বলেন, অর্ধশত টুপি-পাঞ্জাবি পরা লোক আমার ঘরে এসে হামলা চালায়। তাদের দেখে আমার স্বামী অমূল্য দাসকে ঘরের খাটের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলাম। হামলাকারীরা আমাকে মারধর করে ঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। কিন্তু হামলার সময় কোনো পুলিশই এগিয়ে আসেনি।হেফাজতে ইসলাম ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জাম-আত এর সমাবেশ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার অভিযোগ করা হলেও দুটো সংগঠনই হামলায় জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।এ ব্যাপারে জেলা হেফাজতে ইসলামের সহকারী প্রচার সম্পাদক মুফতি এনামুল হক জাগো নিউজকে বলেন, নাসিরনগরে মূর্তি ভাঙচুর ও ঘর-বাড়িতে হামলার ঘটনায় হেফাজতে ইসলাম কোনোভাবেই জড়িত নয়। ইসলাম এসব সমর্থন করে না। আমরা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।জেলা আহলে সুন্নাত ওয়াল জাম-আতের সাধারণ সম্পাদক ইসলাম উদ্দিন দুলাল বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেছি। আমাদের সমাবেশ থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা করা হয়নি। একটি বিশেষ মহল সরকারকে বিব্রত করতেই এই হামলা চালিয়েছে। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে জড়িদের দৃষ্টামূলক শাস্তির দাবি জানান।এদিকে নাসিরনগরে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে শান্তি ও সম্প্রীতি সমাবেশ করেছে প্রশাসন। সোমবার বিকেলে নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় ইতোমধ্যে নাসিরনগর থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাত প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় ইতোমধ্যে নয়জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, যারাই এ হামলার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে আমাদের এখন মূল কাজ হলো নাসিরনগরে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। তিনি আরও বলেন, তদন্ত করে প্রশাসনের কারো বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ পাওয় গেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। যারাই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সবার সহযোগিতা নিয়ে নাসিরনগরকে আবারও শান্তি-সম্প্রীতির জনপদে পরিণত করা হবে।এফএ/পিআর