দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির সাজার পর সন্তর্পণে পা ফেলছে বদির আত্মীয়-স্বজনেরা। মাদক ও মানবপাচারের অভিযোগে তালিকাভুক্তরা রায়ের পর দুই-একদিন গা ঢাকা দিলেও এখন সন্তর্পণে এলাকায় ফিরছে।স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সময়ে বদির কাছ থেকে সুবিধাভোগী ও অর্থলোভী কিছু দলীয় নেতাকর্মীর মাধ্যমে তার মুক্তির আন্দোলন জমাতে পারায় তারা এলাকায় ফিরেছে। টেকনাফের ‘ইয়াবা রাজ্যে’ বদি ও তার অনুসারীদের একচ্ছত্র আধিপত্য হাতছাড়া না করতেই আন্দোলনের আড়ালে পূর্বতৎপরতা চালু রেখেছে তারা। তবে বদির গ্রেফতার মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চাপে ফেলেছে এবং এ চাপ অব্যাহত রাখার কৌশল হিসেবে ইয়াবার পুরনো মামলাও সচল করা হচ্ছে বলে দাবি করছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের করা ইয়াবা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের তালিকায় এমপি বদিকে এ অপকর্মের মূল পৃষ্ঠপোষক বলা হয়। ওই তালিকায় তার ১৭ জন আত্মীয়ের নাম আছে। আবার রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি ও জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে সহায়তাকারীদের তালিকায়ও তিনি আছেন এক নম্বরে। মানব পাচারকারী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকের তালিকায়ও শীর্ষে আছেন এমপি বদি। বদির ছোট ভাই পৌর কাউন্সিলর মৌলভী মজিবুর রহমানের নাম আছে তিন নম্বরে। রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র সরবরাহকারীদের তালিকায় মুজিবরের নাম আছে আট নম্বরে। তালিকার দুই নম্বরে আছেন এমপির আরেক ভাই আবদুর শুক্কুরের নাম। তালিকার চার নম্বরে বদির আরেক ভাই শফিকুল ইসলাম, পাঁচ নম্বরে ফয়সাল রহমান ও আট নম্বরে চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আলমের নাম রয়েছে। আত্মীয়দের মধ্যে তার ভাই আবদুল আমিন, বোন শামসুন্নাহার, বোনের ছেলে সাহেদুর রহমান নিপু, বোনের দেবর হামিদ হোসেন, চাচাতো দেবর আক্তার কামাল, শাহেদ কামাল, জসিম উদ্দিন রাব্বানী, মোয়াজ্জেম হোসেন দানু, বোনের ননদের স্বামী নুর মোহাম্মদ মেম্বার, চাচা শ্বশুর জহির উদ্দিন ওরফে কানা জহির, ফুফাতো ভাই কামরুল ইসলাম ওরফে রাসেল, বেয়াই আফসার, সৈয়দ হোসেন, মফিজুর রহমান, এমপি বদির ফুফাতো ভাই সৈয়দ আলম, নুরুল আলম নুরা, ভাগিনা শামীম ওরফে হাসু ও খালাতো ভাই মং মং সেনের নাম তালিকায় আছে। ২ নভেম্বর বদির সাজার রায়ের পর মাদক ও মানবপাচার তালিকায় থাকা ভাই ও নিকটাত্মীয় সব পুরুষ আত্মগোপনে চলে যান। এমপি বদি মুক্ত থাকাকালীন তারা সবাই এলাকায় বীরদর্পে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতেন। সে সময় স্থানীয় কিংবা জেলা প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে টুঁ-শব্দটিও করতে সাহস পেতো না। তাদের কথায় একপ্রকার উঠ-বস করতে হতো স্থানীয় প্রশাসনকে। তখন তার আত্মীয়-স্বজনেরাও ইয়াবা নিয়ে আটক অনেককে প্রভাব খাটিয়ে ছাড়িয়ে নিতেন।কিন্তু ৬ নভেম্বর থেকে উখিয়া-টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের কিছু নেতার মাধ্যমে বদি মুক্তির আন্দোলনে প্রতিবাদ সমাবেশ শুরুর পর থেকে আত্মগোপনে থাকা স্বজনেরা সন্তর্পণে এলাকায় এসে এসব তদারক করছেন। সমাবেশে আসা নারী-পুরুষকে দিনের বেতন হিসেবে বিলানো হচ্ছে টাকা, এমনটি জানিয়েছেন নাম গোপন রাখার শর্তে স্থানীয় অনেকে। আর যে এলাকায় যার নেতৃত্বে প্রতিবাদ সমাবেশ করা হচ্ছে তিনি পাচ্ছেন মোটা অংকের বিনিময়। বদির ভাইয়েরা সময়মতো এসব টাকা আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। নগদ নারায়ণ পাওয়ায় এক সময়ে বদির বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বক্তব্য প্রদানকারী অনেকে এখন বদির মুক্তি দাবির মঞ্চে উঠছেন, তাকে নিরপরাধ বলে বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে টাকার বিনিময়ে নয়, সম্পূর্ণ মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধ থেকে বদির মুক্তির আন্দোলন করছেন বলে দাবি করেছেন উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং এমপি বদির শ্যালক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী। তিনি দাবি করেন, এমপি বদির জনপ্রিয়তাই তার জন্য কাল হয়েছে। তিনি ২০০৮ সালে এমপি হওয়ার পর থেকে উখিয়া-টেকনাফে নিজস্ব কার্ডের মাধ্যমে এক লাখ দরিদ্র মানুষকে নিয়মিত সহযোগিতা দিয়েছেন। সহযোগিতা দিয়েছেন পাঁচ শতাধিক দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়েতে। এসব কারণে, আন্দোলনে দরিদ্ররাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিচ্ছেন। প্রতিটি ইউনিয়নে পৃথকভাবে প্রতিবাদ সমাবেশ হচ্ছে। এসব আন্দোলনে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সম্মতি রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। কিন্তু টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলী বলেন, কারাদণ্ডাদেশ থেকে মুক্তির পক্ষে যারা প্রতিবাদ করেছেন, তারা সবাই এমপি বদির পোষ্য। এদের মধ্যে অনেকে দলীয় পদবিধারী হলেও তাদের প্রকৃত পরিচয় ‘বদিলীগ’। বদির কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে এদের অনেকে অঢেল টাকার মালিকও হয়েছেন। প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এ অন্যায় প্রতিবাদে কখনো শামিল হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার একটি সূত্র জানায়, এমপি বদি গ্রেফতারের পর সম্ভাব্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নতুন করে তালিকা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। খুঁজে দেখা হচ্ছে মামলার নথি। বদির অবর্তমানে টেকনাফের ইয়াবা সাম্রাজ্যে ধস নামাতে আগের তালিকাভুক্তদের কোথায় কী মামলা আছে, তা রেকর্ডভুক্ত করা হচ্ছে। র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, টেকনাফের ইয়াবা বাজার সঙ্কোচন করতে সম্ভাব্য সবার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কার বিরুদ্ধে অতীতে কী মামলা হয়েছে -সেসবেরও খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, আর কোনো গডফাদার যাতে আবির্ভূত না হয় -সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা বলেন, আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান করা অপরাধ। তাছাড়া আমরা সবাই সরকারেই রয়েছি। সুতরাং মিছিল-মিটিং করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা যাবে না। আপিলের পথ খোলা রয়েছে। আইনকে সম্মান জানাতে আন্দোলনকারীদের সতর্ক করা আছে। টেকনাফ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মজিদ এমপি বদির ভাই ও স্বজনেরা এখন এলাকায় রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, তারা প্রতিবাদ সভাগুলো তদারক করছেন। উল্লেখ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ইয়াবা ব্যবসা, মানবপাচার, জঙ্গি-সম্পৃক্ততা, সরকারি কর্মকর্তা ও নিজ দলের সিনিয়র নেতাদের মারধরসহ নানা কারণে দেশব্যাপী আলোচিত-সমালোচিত সংসদ সদস্য বদি। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো অইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ও সাংবাদিকদের অপপ্রচার বলে বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু রায়ের পর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগই সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে বলে মন্তব্য রাজনৈতিক বোদ্ধা মহলের।সায়ীদ আলমগীর/এফএ/পিআর