দেশজুড়ে

নিম্নচাপের প্রভাবে নোয়াখালীতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

গত বছর ৩০ একর জমিতে ধান চাষ করে তিন লাখ টাকা লোকসান হওয়ার পরও এবার ঋণ করে জমিতে ধান চাষ করেছেন। কিন্তু গত শুক্রবার থেকে রোববার টানা প্রবল বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়ায় জমির সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কী করে ঋণ পরিশোধ করে আবার ফসল চাষাবাদ করবেন। এ দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বার ইউনিয়নের কৃষক কামালের।কামালের মতো এরকম আরো হাজারে কৃষক রয়েছেন যাদের সর্বশান্ত করে গেছে নিম্নচাপেরপ্রভাবে হওয়া প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া। জেলার শস্যভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত উপকূলীয় উপজেলা সুবর্ণচরে ঘুরে দেখা গেছে, মাইলের পর মাইল জমিতে লাগানো ধান নুয়ে পড়েছে। কয়েকদিন পর যে ধান কাটার কথা ছিলো সেগুলোর বেশির ভাগ ধান গাছ এখন পানিতে নিমজ্জিত। চরআমানউল্যাপুর ইউনিয়নের কৃষক সোলেমান মিয়া বলেন, ধান ক্ষেতের দিকে তাকাতে তার ইচ্ছা হয় না। তাকালে শুধুই কান্না আসে। এমনিতে ধান চাষ করে ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না । তারপরেও চাষ করতে হয়। না হলে জমিগুলো খিল বা খালি হয়ে পড়ে থাকবে। এতে নিজেরও ক্ষতি আবার দেশেরও ক্ষতি হয়। এ ভেবে অন্তত পরিবারের সদস্যদের বছরের খাওয়ার চাল হবে এ আশায় জমি চাষ করা হয়। কিন্তু একের পর এক দুর্যোগ তাদের মাথার ওপর নেমে আসে। না হয় খরা না হয় ঝড়-তুফান। এখন জমির যে অবস্থা হয়েছে তাতে ধানগুলো ঘরে তুলতে আগের চেয়ে দ্বিগুণ শ্রমিক খরচ লাগবে। আবার ফলনও ভালো পাওয়া যাবে না। সব মিলিয়ে দেনা থেকে তারা আর মুক্ত হতে পারবে না। কথা হয় কৃষক আলাউদ্দিনের সঙ্গে। তারও মন খারাপ। জমির আধা পাকা-কাঁচা সব ধানগাছ এখন পানির নিচে। এগুলো আর দুই তিন দিন থাকলে পচন ধরে যাবে। যদি পানি সেচ করা যায় কিছু রক্ষা হবে। কিন্তু ফলন আগের মতো হবে না। সে আরো জানায়, মে মাসে একবার তুফান হয়েছিলো (ঘূর্ণিঝড় রোয়ানো) । তারপরে আবার বর্ষকাল। টানা বর্ষণে প্রায়ই বীজতলা ডুবে যায়।  এ কারণে অনেক জমিতে একাধিকবার চারা রোপণ করে পুনরায় জমি চাষাবাদ করে। ব্যাপক আর্থিক লোকসান দিয়ে চলতি মৌসুমে রোপা আমন চাষ করে বাম্পার ফলনের মুখ দেখলেও শেষ মুহূর্তে আবার তারা  ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে।চর আমানউল্যাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য লিটন চন্দ্র দাস জাগো নিউজকে জানান, সুবর্ণচর উপজেলার শতকরা ৯৫ ভাগ লোক কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল এবং বেশির ভাগই বর্গাচাষী। বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তারা কৃষিকাজ করে থাকেন। এখন তারা যে লোকসানের মুখে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের পাশে সরকার না দাঁড়ালে ঋণের কারণে এদের মরা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না। নোয়াখালী কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৯টি উপজেলা চলতি আমন মৌসুমে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫৪১ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া ও সুবর্ণচরে সবচেয়ে বেশি চাষাবাদ করা হয়েছে। তার মধ্যে হাতিয়া উপজেলায় ৬৩ হাজার ৫৩৮ হেক্টর  এবং সুবর্ণচর উপজেলায় ৩৭ হাজার ২০০, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ২২ হাজার ২৮০ এবং সদরে ১৭ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ  করা হয়েছে। এছাড়া ৯টি উপজেলায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন  প্রকারের শীতকালীন সব্জির চাষ করা হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে শীতকালীন সব্জির চাষ হয় সুবর্ণচরে ৩৫০ হেক্টর, হাতিয়ায় ২৫০ হেক্টর, কোম্পানীগঞ্জে ১২৫ ও সদরে ১২০ হেক্টর জমিতে। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে টানা তিন দিনের প্রবল বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়ায় উপকূলীয় তিনটি উপজেলা হাতিয়া, সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জ  ও সদরের কিছু এলাকায়সহ ৯টি উপজেলায় রোপা আমন ৪৭ হাজার ৮৪৫ হেক্টর (৩১%) ও শীতকালীন সব্জি ৯০০ হেক্টর (৩৬%) ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে হাতিয়ায় ২২ হাজার ৯৪৮ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান এবং শীতকালীন সবজি ২৫০ হেক্টর, সুবর্নচরে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান এবং শীতকালীন সবজি ৩৫০ হেক্টর, সদরে ৪ হাজার ৪৭৭ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান এবং ১২০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজির জমি আক্রান্ত হয়েছে। সুবর্ণচর উপজেলার কৃষি অফিসার গোলাম মোস্তফা জাগো নিউজকে জানান, জমিতে জো (উর্বর) থাকার কারণে কৃষকরা ধানের পাশাপাশি জমিতে খেসারিসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজির ও চাষ করেছিলো ।  কিন্তু সেগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ জন্য তিনি কৃষকদের প্রণোদনার মাধ্যমে সার, বীজ ও কীটনাশক প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ করেন।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক প্রণব ভট্রাচার্য্য নিম্নচাপের কারণে উপকূলীয় এলাকাগুলো বিশেষ করে হাতিয়া ও সুবর্ণচরসহ আরো কয়েকটি উপজেলায়  রোপা আমন ও শীতকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির কথা স্বীকার করে জাগো নিউজকে  জানান, তিনি গত দুই দিন সুবর্ণচরের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিদর্শন করেছেন। ইতোমধ্যে তারা কি পরিমাণ জমি আক্রান্ত হয়েছে তার তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছেন। তবে জমির পানি নিষ্কাশন হয়ে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা হবে। তিনি কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে জন্য সয়াবিন,খেসারী,শীতকালীন আগাম সবজি চাষের নির্দেশনা দেন।এ বিষয়ে সুবর্ণচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও  জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ এএইচ এম খায়রুল আনাম সেলিম চৌধুরী জাগো নিউজকে জানান, তারা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করছেন। মিজানুর রহমান/আরএআর/এমএস