দেশজুড়ে

ভয়ঙ্কর সেই দিনে ৫৫ জনের মৃত্যু দেখেছেন সাহিদা

আজ শনিবার (১২ নভেম্বর) সেই ভয়াল। দেশের ৭১০ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকাসহ দক্ষিণের ১৩টি জেলার প্রায় দেড় কোটি মানুষের কাছে বিভীষিকার ভয়াল ১২ নভেম্বর।১৯৭০ সালের এই দিনে পুরো উপকূলবাসীর জীবনে নেমে আসে এক মহাদুর্যোগ। মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে নিমিষে উপকূলীয় চরাঞ্চলে ১০ থেকে ১২ ফুট পানিতে বাড়িঘর, সোনালি ফসলের মাঠ, উঠানে স্তূপাকার ও গোলা ভরা পাকা ধান তলিয়ে যায়। স্রোতের তোড়ে হাজার হাজার মানুষ ও কয়েক লাখ গরু-মহিষ ভেসে যায়। বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয় পুরো উপকূলীয় এলাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যাপক ফসলি জমি, প্রাণী ও বনজসম্পদ। এখনো উপকূলের বেশিরভাগ এলাকাই অরতি, মৃত্যুঝুঁকিতে ৩ লক্ষাধিক মানুষ। বনাঞ্চল কাটা হয়েছে, বেড়িবাঁধ নেই, গড়ে উঠেছে হাজার হাজার মানুষের বসতি। সত্তরের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে মারা যাবে কয়েক লাখ মানুষ। সেদিনের ঝড়ে ৩ মেয়ে ও ২ বোন হারিয়েছেন ভোলার দৌলতখানের ভবানিপুর ইউনিয়নের রাসেদা বেগম। দেখেছেন মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই আর স্বজনহারা মানুষের আহাজারি। ঝড়ের বর্ণনা করতে গিয়ে আজো আতকে উঠেন তিনি। স্বজন হারিয়ে যেন আজো বাকরুদ্ধ রাসেদা। দিনটির কথা স্মরণ করে স্থানীয় নুরুল ইসলামের স্ত্রী সাহিদা বেগম বলেন, ভবানীপুরের তাজউদ্দিন পাটেয়ারী বাড়ি। সেই বাড়িতে ২০ ঘর। সেখানে ২০০ মানুষের বসবাস। আমিও ছিলাম তাদের সঙ্গে। চোখের সামনেই মারা গেল ৫৫ জন। কে কোথায় গেল কারো মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। কান্না জড়িত কণ্ঠে সাহিদা বেগম বলেন, সেই ঝড়ে বড় সাহানুর, মেজো মেয়ে তাছনুর, ছোট মেয়ে মিনা ও দুই বোন রোকেয়া ও রাবেয়া কোথায় যে চলে গেল। আজো তাদের সন্ধান পাইনি। আমিও যাওয়ার পথে। জানি না তাদের দেখা পাবো কিনা।  শুধু রাসেদা বেগম নয়, তার মতো স্বজনহারা এমন মানুষের সংখ্যা অনেক। বেশিরভাগ পরিবারেরই বেঁচে থাকার মতো কেউ ছিলো না। সেই ঝড়ে দ্বীপজেলা ভোলা জেলার সাত উপজেলার বিস্তৃর্ণ জনপদ লণ্ড ভণ্ড হয়ে বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। মারা যায় এক লাখের অধিক মানুষ। ঝড়ের ক্ষতচিহ্নের বর্ণনা করতে গিয়ে আজো শিউরে উঠেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। সেদিনের ঝড়ে স্বজনহারা মনির বলেন, ঝড়ে আমার তিন বোনকে হারিয়েছে। তাদের কথা মনে করে আজো মা কাঁদেন।তুলাতলী এলাকার বাদশা মিয়া বলেন, মেঘনা নদী দিয়ে মানুষের মরদেহ ভাসতে দেখেছি। পরিচিত কাউকে উদ্ধার করেছি। বাকি মরদেহ স্রোতে ভেসে গেছে।স্থানীয় রহমত আলী, ছিদ্দিক ও সিরাজ উদ্দিন বলেন, সেদিনের ঝড়ে মদনপুরের ১৮টি ঘরের মধ্যে ৪০ জনের মরদেহ পাওয়া যায়। একটি পরিবারে কেউ বেঁচে ছিলেন না।প্রত্যক্ষদর্শী শাহে আলম বলেন, সেদিন দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ছিল। রাতে পুরো দমে ঝড় শুরু হয়। ভোরে জলোচ্ছ্বাসে মানুষ মারা যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল মনপুরা, চরফ্যাশন, লালমোহন উপজেলায়। ভয়ানক সেই ঝড়ের কথা এখনো ভুলেনি উপকূলের মানুষ। ঝড়ের কয়েকদিন পর সামান্য কিছু সাহায্য মিলেছে। গাছে ঝুলে ছিল অনেকের মরদেহ। বাঁচার লড়াই করেছেন অনেকে। কেউ বেঁছেছেন তবে বেশিরভাগই তাদের স্বজনদের হারিয়েছেন।  এদিকে উপকূলবাসীদের অভিযোগ, উপকূলে একের পর এক দুর্যোগ আঘাত হানলেও আজো উপকূলবাসীর জন্য টেকশই বেড়িবাঁধ কিংবা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ হয়নি। প্রতিবছরই ঝড় আসে। অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু  এখানের মানুষ মৃত্যু ঝুঁকিতে ভোগে। ঝড় কিংবা ঘূর্ণিঝড় আসলেই মৃত্যু তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।ছোটন সাহা/এএম/এমএস