দেশজুড়ে

আমাগো কথা শুনেন, বাপ-দাদার জমি ফিরাইয়া দেন

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ (বাগদা-কাটা) এলাকায় উচ্ছেদ ও লুটপাটের ঘটনার ৯ দিনেও মাদারপুরের সাঁওতালপল্লীতে আতঙ্ক কাটেনি। সেই সঙ্গে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করায় সাঁওতালপল্লীর লোকজনের মধ্যে দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। সারাদিনে মাত্র একবেলা খেয়ে দিনাতিপাত করছেন তারা। সাঁওতালপল্লীতে থাকা সরেন, টুন্ডু সরেন ও মার্ডির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবারগুলো অত্যন্ত সংঘবদ্ধ এবং বিক্ষুব্ধ। তাদের একটাই কথা, ‘একই কথা কতবার বলবো। একই কথা বার বার বলতে বলতে গলা শুকিয়ে গেছে। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।’তারা বলেন, ‘আগে আমাগো কথা শুনেন। দাবি-দাওয়াগুলো পূরণ করেন। বাপ-দাদার জমি ফিরাইয়া দেন। তারপর অন্য কথা। হামার (আমার) বাড়িঘর জ্বালাইয়া দিলো। পালিত একটি ছোট্ট শুয়োরের বাচ্চা পর্যন্ত লুট করে নিয়া গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কোন বিচার হইল না।’ সরেজমিনে দেখা যায়, আধিবাসীদের উচ্ছেদ করার পর ধ্বংসস্তূপে আখ রোপণ ও চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া হয়েছে। এতে স্বাভাবিক চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় ক্রমেই ক্ষোভ বাড়ছে সাঁওতালপল্লীর বাসিন্দাদের।এদিকে ঘটনার ৯ দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি। এছাড়া সাঁওতালদের তিনজন নিহত হলেও থানায় মামলা হয়নি। এছাড়া কয়েক দফায় সাঁওতালপল্লীতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন খোঁজ খবর নিলেও তাদের চলমান দাবি-দাওয়ার কোনো সুরাহা হয়নি। ফলে একদিনে আতঙ্ক অন্যদিকে ক্ষোভ নিয়ে অনেকটা অসহায়ের মতো দিন কাটছে কর্মহীন সাঁওতালদের।মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের জয়পুরপাড়া ও মাদারপুর গ্রামের সাঁওতালপল্লীতে দেখা যায়, দুই গ্রামে অবস্থান নেয়া ৬ শতাধিক সাঁওতাল পরিবারের মধ্যে খাদ্য সংকট বিরাজ করছে। অর্থ-যোগানের ব্যবস্থা না থাকায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও ক্রয় করতে পারছেন তারা। কাজের সুযোগ না থাকায় শ্রমজীবী সাঁওতাল পরিবারের লোকজন সারাদিনে একবেলা অর্থাৎ রাতে খেয়ে মানববেতর জীবনযাপ করছেন।অপরদিকে সাঁওতালপল্লীর ইস্যুটি ব্যাপক আলোচিত হওয়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে কিছুটা একঘরে হয়েছেন তারা। পক্ষে-বিপক্ষে কিছু গণমাধ্যমে অপপ্রচার করায় সহজে কারো কাছে নিজেদের দাবি দাওয়া নিয়ে এখন আর মুখ খুলতে চাইছেন না তারা। সোমবার স্থানীয় প্রশাসন খাদ্যসামগ্রীসহ এক ট্রাক ত্রাণসামগ্রী সাঁওতালপল্লীতে পাঠালেও দিন শেষে তা ফেরত পাঠানো হয়। ইতোমধ্যে রোববার (১৩ নভেম্বর) আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি প্রতিনিধি দল সাঁওতালপল্লী পরিদর্শন করেছে। এ সময় সাঁওতালরা আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে সহিংসতা এবং তাদের পৈতৃক সম্পত্তি ফিরে পাওয়াসহ সুনির্দিষ্ট দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেন। এছাড়া বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নেতা ও মানবাধিকার কমিশনের পরিচালকসহ জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন নেতা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু তাদের সবার কাছে সাঁওতালদের উত্থাপিত দাবি-দাওয়া সম্পর্কে কেউ কোনো কথা বলেনি। ফলে সাঁওতাল পরিবারগুলো চরম হতাশায় দিনাতিপাত করছে।এ ব্যাপারে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাসকে, পাওলুস মাস্টার ও মাদারপুর গ্রামের ইলিখা মার্ডির সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি থেকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত করার পদক্ষেপ হিসেবে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে জমিগুলো ঘেরাও করছে প্রশাসন। অবিলম্বে কাঁটাতারের বেড়া তুলে নেয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধও জানান তারা। তারা আরো বলেন, মিল কর্তৃপক্ষের কথামতো প্রশাসন ও পুলিশ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বিনা নোটিসে এবং কোন উচ্ছেদ নীতিমালা না মেনে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে। পুলিশের গুলিতে ৩ জন নিহত ও ৮ জন নিখোঁজ ব্যক্তির ক্ষতি পূরণে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।প্রসঙ্গত, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ১৯৬২ সালে আখ চাষের জন্য গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ এলাকায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ১ হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ওইসব জমিতে মিল কর্তৃপক্ষ আখ চাষ না করে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর কাছে লিজ দেয়। এরপর ওইসব জমিতে তামাক, ধান, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করা হয়।মিলের জমিতে আখ চাষ না হওয়ায় দুই বছর আগে বাপ-দাদার জমি ফেরৎ দেবার কথা বলে প্রভাবশালী নেতারা সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকজনকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করে। গত ৬ নভেম্বর পুলিশ-ইক্ষু শ্রমিক ও সাঁওতালদের ত্রিমুখী সংঘর্ষে দুই সাঁওতাল নিহত হয়। আহত হয় পুলিশসহ ৩০ জন। তবে সাঁওতালদের মতে নিহত ৩ এবং নিখোঁজ ৮ জন। এরপর ওই এলাকায় সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়।  এএম/এমএস