দেশজুড়ে

‘কখনো ভাবিনি বেঁচে থাকবো’

‘শামসুদ্দিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর। ১১নং সেক্টরে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তার অবদান চীর উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।’১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়। যুদ্ধের পর দেশরক্ষা বিভাগ থেকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী স্বাক্ষরিত স্বাধীনতা সংগ্রামের সদনপত্রে শামসুদ্দিনকে দেয়া হয় স্বীকৃতি।তবে স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অবদান চীর উজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি এখনো। সহযোগীদের অনেকেই আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত। এমনকি কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও জীবন-জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ ৩০ বছর ঢাকায় রিকশা চালিয়েছেন। জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় রিকশার চাকা ঘুরিয়েও ঘুরাতে পারেননি জীবনের চাকা। শামসুদ্দিনের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি আজও। এমনকি জীবনের শেষ বেলায় এসেও নিজের বীরত্বের স্বীকৃতির জন্য ঘুরছেন এখানে-সেখানে। দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার দ্বীপেশ্বর গ্রামের মৃত ছেলামতের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিন। বয়স ৮৫। বয়সের ভারে কাতর রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিন সামু। এলাকায় পরিচিত ‘সামু পাগলা’ হিসেবে। শামসুদ্দিন সামু জানান, ‘যুদ্ধের সময় প্রতিটি দিনকেই জীবনের শেষ দিন মনে হতো। কখনো ভাবিনি বেঁচে থাকবো। যুদ্ধের মাঠে প্রতিনিয়ত স্ত্রী-সন্তানের কথা মনে পড়তো। তবে প্রতিজ্ঞা ছিল দেশ স্বাধীন না করে ঘরে ফেরবো না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায়। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালাই। এভাবে কেটে যায় দীর্ঘ ৩০ বছর। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কিছু দিন পর জানতে পারি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হচ্ছে। তাই বাড়ি ফিরে আসি। এর আগে ১৯৯৮ সালে কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কাউন্সিল থেকে আমাকে রিকশা কেনার জন্য ১৫ হাজার টাকা দেয়া হয়। বাড়ি এসে জানতে পারি মুক্তিযোদ্ধা সংসদে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে হবে। সে অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছি। এরপর থেকে বছরের পর বছর ঘুরছি মানুষের দ্বারে দ্বারে। কিন্তু এখনো কাগজপত্র ঠিক হয়নি।’ তিনি আরো বলেন, এখন আমার মৃত্যুর সময় হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শেষ ইচ্ছা জীবিত অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেখে যেতে চাই। আর মুত্যুর পর যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আমার মরদেহ দাফন করা হয়।মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার আর রাজাকারদের কাছে আতঙ্কের নাম ছিল সামু পাগলা। যুদ্ধক্ষেত্রে অসীম সাহসিকতার জন্য শামসুদ্দিন আর তার চার ভাইয়ের বীরত্বের কথা আলোচিত হতো মুখে মুখে।কিন্তু একাত্তরের টগবগে যুবক শামসুদ্দিন আজ জীবনযুদ্ধে পরাজিত সৈনিক। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জীবন বাঁচাতে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকায় চলে যান। তার আরেক ভাই মুক্তিযোদ্ধা খুশিদও ঢাকায় পাড়ি জমান।  মিরপুরের কচুক্ষেত পুরানবাজার এলাকায় বসবাস করে দুই ভাই রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এভাবে কেটে যায় দীর্ঘ ৩০ বছর। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এখনো তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। এলাকায় থাকা তার দুই ভাই রইছ উদ্দিন ও রশিদ তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা পেলেও সামু পাগলা আর তার ভাই খুশিদ এখনো বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধার পাওনা অধিকার থেকে।মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে স্থানীয় রাজাকাররা শামসুদ্দিনের বড় ভাই হাইসুদ্দি ওরফে হাইসুকে হত্যা করে। কিন্তু ভাইকে হত্যার পরও ভেঙে পড়েননি সামু পাগলা। অপর তিন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। স্থানীয়ভাবে আগ্নেয়াস্ত্রের ট্রেনিং নিয়ে ১১নং সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে কোম্পানি কমান্ডার মফিজ মাস্টারের অধীন তিনি বিভিন্ন স্থানে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া ছাড়াও আশপাশের বেশকিছু এলাকায় পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেন সামু পাগলা। তবে সামু পাগলার কাছে সবচেয়ে স্মৃতিজাগানিয়া যুদ্ধ ছিল কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার প্যারাভাঙা যুদ্ধ। এ যুদ্ধে হারাতে হয় সমরবন্ধু শহীদ খায়রুল জাহান বীরপ্রতীক, সেলিমসহ নাম না জানা আরো অনেককে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন শুরু হয়। খবর পেয়ে ২০০০ সালের দিকে স্ত্রী সন্তান নিয়ে বাড়ি আসেন শামসুদ্দিন। কিন্তু এরই মধ্যে প্রথম দফায় মুক্তিযোদ্ধা তালিকা যাচাই-বাছাই শেষ হয়ে যায়। তখন থেকেই নিজের মর্যাদা আদায় করার সংগ্রামে লিপ্ত এ বীর যোদ্ধা। চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ে নিয়ে সংসার। ছেলেরা যে যার মতো নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। এ অবস্থায় স্ত্রী নূরুন্নেছা কোনো মতে স্বামীর ভরণ-পোষণ চালাচ্ছেন। মাস শেষ হলে তাকিয়ে থাকতে হয় ছেলেদের দিকে। বছরের বেশির ভাগ সময় অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে। ছেলে কামাল জানান, বাবা মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় আমাদের পুরো পরিবারকে অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। বাবা আর চাচা ঢাকায় দীর্ঘদিন রিকশা চালিয়ে আমাদের বড় করেছেন। এখন আমরা অপেক্ষা করছি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি সুবিধা পেলে শেষ জীবনে বাবা একটু সুখের দেখা পাবেন। শামসুদ্দিনের স্ত্রী বলেন, ‘আমার স্বামী ও তার চার ভাই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। এ জন্য আমাদের ওপর অনেক নির্যাতন চালানো হয়। যুদ্ধের সময় মেয়েদের নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যাই। কিন্তু সেখানেও হানা দেয় রাজাকাররা। তারা আমার মাকে ধরে নিয়ে যায়। পরে অবশ্য বৃদ্ধ বলে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘যুদ্ধের ৯ মাসে একবারও স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়নি। তিনি বেঁচে আছেন কিনা তাও জানতাম না। সন্তানদের নিয়ে অনেক দিন আখ খেতে ঘুমিয়েছি।’ হোসেনপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. আব্দুস সালাম, জানান, ‘শামসুদ্দিন সামু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমরা একসঙ্গে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছি। তিনি আমার সহযোদ্ধা। তার পরিবারের পাঁচ ভাই মুক্তিযোদ্ধা। একজনকে যুদ্ধের সময় কুপিয়ে হত্যা করা হয়।’ তিনি আরো জানান, তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি ও যাচাই-বাছাইর সময় সামু ও তার ভাই খুশিদ ঢাকায় ছিলেন। এলাকায় না থাকায় তাদের নাম বাদ পড়ে। তবে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তারা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক বিবেচিত হয়েছেন। কিছু দিনের মধ্যেই সামু ও তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন বলে জানান তিনি।      এআরএ/পিআর