দেশজুড়ে

আজকের দিনে মুক্ত হয়েছিল টাঙ্গাইল

১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও পলায়নের মধ্যে দিয়ে মুক্ত হয়েছিল টাঙ্গাইল। সারা রাত মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণ ও প্রচণ্ড গোলাগুলিতে বিনিদ্র রাত কাটায় শহর ও শহরতলির সাধারণ মানুষ। অবশেষে সে কাঙ্খিত মুহূর্তটি আসে। ধ্বংসস্তুপ আর স্বজনহারাদের বিয়োগ ব্যাথা ভুলে হাজার হাজার উৎফুল্ল জনতা রাস্তায় নেমে মুক্তির আনন্দে মেতে ওঠে।জানা যায়, জেলার কাদেরিয়া বাহিনীর খেতাবপ্রাপ্ত মোট মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন ১৮ জন। এর মধ্যে একজন বীর উত্তম, তিনজন বীরবিক্রম ও ১৪ জন বীরপ্রতীক। টাঙ্গাইল মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের সাংগঠনিক কমান্ডার জয়নাল আবেদীন ফারুক জানান, টাঙ্গাইলের কৃতি সন্তানদের মধ্যে প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আব্দুল মান্নান, টাঙ্গাইল, জামালপুর এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত এমপি শামছুর রহমান খান শাজাহান ছিলেন অন্যতম। এক পর্যায়ে টাঙ্গাইলে গঠিত হয় কাদেরিয়া বাহিনী। এই বাহিনী প্রচণ্ড প্রতিরোধ ও প্রত্যাঘাত শুরু করে পাক সেনাদের উপর। ক্রমান্বয়ে সংগঠিত হতে থাকে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা। শেষ পর্যন্ত এর সংখ্যা দাড়ায় ১৭ হাজারে। টাঙ্গাইলে ৮ ডিসেম্বর প্রায় পাঁচ হাজার পাক সেনা এবং সাত হাজার রাজাকার আলবদর অবস্থান করে। খান সেনাদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য যমুনা নদী পথে পাঠানো হয় সাতটি জাহাজ ভর্তি অস্ত্র ও গোলাবারুদ। কাদেরিয়া বাহিনী গোপনে এই খবর পেয়ে কমান্ডার হাবিবুর রহমান হাবিবকে দায়িত্ব দেয় জাহাজ ধ্বংস করার জন্য মাইন পোতার কাজ। জীবন বাজি রেখে মাটিকাটা নামক স্থানে জাহাজ বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। দুটি জাহাজে দুই রাত দুই দিন ধরে চলতে থাকে অনবরত বিস্ফোরণ। বাকী জাহাজগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় জেলার বিভিন্ন স্থানে। মুক্তি বাহিনীর এ সকল আক্রমণ ও গোলাবারুদ ধ্বংস এবং অস্ত্র উদ্ধারে খান সেনারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর ৮ তারিখ পর্যন্ত টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় বিশাল কাদেরিয়া বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পর্যদস্ত করে খান সেনাদের। এসব যুদ্ধে প্রায় তিন শতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধাদের টাঙ্গাইল অঞ্চলের প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী যোদ্ধাদের নিয়ে সখিপুরের সহানন্দা ও কীর্ত্তনখোলায় গড়ে তুলের দুর্ভেদ্য দুর্গ। একর পর এক আক্রমণের মুখে পাক সেনারা গুটিয়ে জেলার অন্যান্য স্থান থেকে এসে যখন অবস্থান নেয় টাঙ্গাইল শহরে। তখন উত্তর ও দক্ষিণ টাঙ্গাইল ছিল সম্পূর্ণ মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ৮ ডিসেম্বর পরিকল্পনা করা হয় টাঙ্গাইল আক্রমণের। মিত্র বাহিনীর সঙ্গে সংর্ঘষ হয় পাক সেনাদের পুংলি নামক স্থানে। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রাণ ভয়ে পাক সেনারা সারা রাত ধরে টাঙ্গাইল ছেড়ে ঢাকার দিকে পালায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী চারদিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে পাক সেনাদের টাঙ্গাইল থেকে বিতারিত করতে সক্ষম হয় কাদেরিয়া বাহিনী। ১০ ডিসেম্বর রাতে টাঙ্গাইল প্রবেশ করেন কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক ভোলা। ১১ ডিসেম্বর সকালে কমান্ডার বায়োজিদ ও খন্দকার আনোয়ার টাঙ্গাইল পৌঁছেন। আসেন বিগ্রেডিয়ার ফজলুর রহমান। সার্কিট হাউজে অবস্থানরত খান সেনাদের কাদের সিদ্দিকীর কাছে আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয় টাঙ্গাইল। দিবসটি পালন উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ও টাঙ্গাইল পৌরসভার পক্ষ থেকে ১১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ণাঢ্য র‌্যালিসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।আরএআর/এমএস