বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধকালে নির্যাতিত নারীদের বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান জানান। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় তখন থেকেই বীরাঙ্গনাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এই প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) এর ৩৭তম সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকার তিন ধাপে ১৭০জন বীরাঙ্গনার নাম তালিকাভুক্ত করে। কিন্তু এখনো অনেক বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি পান নি।। তেমনি স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি পায়নি রাজবাড়ীর নুরজাহান বেগম (৫৯)। জেলার বালয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের বীরাঙ্গনা তিনি।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের হাতে দীর্ঘ তিন মাসের অধিক বন্দী থাকার পর তাকে ফিরে আসতে হয় বীরাঙ্গনা উপাধি নিয়ে। যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৫ বছর। নুরজাহান মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার চর-চৌগাছি গ্রামের মনির উদ্দীন মোল্লার ছেলে মোকাররম মোল্লার স্ত্রী। নুরজাহান বেগম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি কিশোরী ছিলাম। তবুও নরপশু রাজাকাররা আমাকে রেহাই দেয়নি। মা ও ছোট ভাইকে মারপিট করে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল তারা। আমাকে তুলে দিয়ে ছিল আবাঙালি বিহারীদের হাতে। একটি বন্ধ ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন চলতো আমার উপরে। চিৎকার করে কাঁদলেও বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি কেউ। তিনি বলেন, দিনে এক বেলা অথবা দুই বেলা খাবার দিত আমাকে। এভাবে প্রাই তিন মাসেরও অধিক সময় অসহায় অবস্থায় অমানবিক নির্যাতন সইতে হয়েছে আমাকে। আমার মতো আরো ১৫/১৬ জন নারীকে সে সময় আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। তার মধ্যে দুই জন মারাও যায়। যারা বেঁচে ছিলাম তারা প্রতিনিয়ত ডাকতাম আল্লাহকে। বলতাম এই হায়নাদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা কর। নুরজাহান বেগম আরও বলেন, ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর রব বাহিনী আমাকে উদ্ধার করে। মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে উদ্ধার করে বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার পর শুরু হয় আমার আরেক জীবন যুদ্ধ। টানা এক মাস চিকিৎসা নিতে হয় আমাকে। সুস্থ হওয়ার পর বুঝতে পারি আমি যেন চিড়িয়াখানার কোন যন্তু। প্রতিবেশীরা সামনে কিছু না বললেও লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে দেখতো। মাঝে মধ্যেই কটুকথা বলতো। মনের আবেগে জীবন ত্যাগের নানা রকম কথা চিন্তা করলেও আমার বৃদ্ধ মা মানু বিবির মুখের দিকে তাকিয়ে ভুলে যেতাম সে সব ভাবনা। তিনি বলেন, আমাকে নিয়ে আমার মা এবং ছোট ভাইও সব সময় চিন্তা করতো। নরপশুদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া এই আমাকে কে বিয়ে করবে। অবশেষে ১৯৭৩ সালে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার চরচৌগাছি গ্রামের মৃত মনির উদ্দিন মোল্লার ছেলে মোকারম মোল্লার সাথে আমার বিয়ে হয়। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস স্বামীর বাড়িতে যাওয়া হলো না। আমার অতীত জেনে তারা বৌ হিসেবে মেনে নেয়নি। একই সঙ্গে আমার স্বামীকে ছেড়ে আসতে হয় তার বাবার বাড়ি। নুরজাহান বেগম বলেম, বর্তমান আমি ভাইয়ের দেয়া ১২ শতাংশ জমিতে কোনো রকমে একটি ঘর করে বসবাস করছি। আমার এক ছেলে ও চার মেয়ে। তাদেরকে বিয়ে দিয়েছি। সরকারিভাবে উপজেলা প্রশাসন থেকে ১০ শতাংশ জমি বন্দোবস্ত দিলেও তার দখলদারিত্ব এখনও বুঝে পায়নি।নুরজাহানের স্বামী মোকাররম বলেন, বয়সে তখন কিশোর হলেও স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মাগুরার চৌগাছিতে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের প্রতি ছিল আমার দুর্বলতা। তাই নুরজাহানের সন্ধান পেয়ে সমাজের কুরুচিপূর্ণ মানুষের অভিব্যক্তিকে প্রাধান্য না দিয়ে আমি সিন্ধান্ত নেই তাকে বিয়ে করবো। তবে বিয়ের পর লোকের কাছ থেকে অনেক কটু কথা শুনতে হয়। আমি বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে, তারাও আমাদের এই বিয়েকে মেনে নিতে পারেনি। উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত শ্বশুর বাড়িতেই বসবাস শুরু করি।নবাবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাসান আলী জানান, আমিও জানি তিনি একজন বীরাঙ্গনা। আশা করছি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বর্তমান সরকার এই বীরাঙ্গনা দ্রুত স্বীকৃতি প্রদান করবে। বালিয়াকান্দি উপজেলার ভাইস-চেয়ারম্যান হারুন-অর-রশিদ মানিক বলেন, যাদের সম্মান-সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি তাদের মধ্যে একজন বীরাঙ্গনা নুরজাহান বেগম। আমি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যেন তাকে দ্রুত বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি দেয়া হয়।বালিয়াকান্দি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল মতিন ফেরদৌস বলেন, নুরজাহান বেগম একজন বীরাঙ্গনা। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে সাহায্য করা হয়েছে, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। মুক্তিযোদ্ধাদের মত বীরাঙ্গনাদেরকেও স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে। নুরজাহান বেগমকেও স্বীকৃতি দেয়া হবে।রুবেলুর রহমান/আরএআর/আরআইপি