স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৫ বছরে বেশ কয়েকটি গণকবরের সংস্কার করা হলেও কয়েকজন শহীদের কবর রয়েছে অরক্ষিত। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা এসব কবর এখন নিশ্চিহ্ন প্রায়। সরকারের পক্ষ থেকে এগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কারের কথা বলা হলেও তা প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তেমনি সম্মুখযুদ্ধে শহীদ মেহেরপুর সদর উপজেলার শৈলমারী গ্রামের মহর আলীর কবর পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়। এ নিয়ে ক্ষোভ বেড়েছে শহীদ পরিবারে। তবে ডিসেম্বরের মধ্যেই কবরটি সংরক্ষণের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন মেহেরপুর সদর উপজেলার শৈলমারী গ্রামের তিন যুবক মহর আলী, ইউসুফ আলী ও আজহার আলী। একাত্তরের ৩ মে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নির্দেশে তারা তেরঘরিয়া গ্রামের একটি কালভার্ট ভেঙে ওই গ্রামের একজনের বাড়িতে খাবারের জন্য যান। খাবার শেষ না হতেই পাক সেনারা ঘিরে ফেলে বাড়িটি। কোন রকমেই পালিয়ে গিয়ে গ্রামের একটি মাঠে অবস্থান নেন তারা। সেখানেও চারদিক থেকে তাদের ঘিরে গুলি করে পাক সেনারা। শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। এ সময় পাক সেনাদের ছোড়া একটি মর্টার শেল মহর আলীর মাথায় আঘাত হানে। ঘটনাস্থলেই তিনি শহীদ হন। এ সময় তার সহযোগী দুই মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে পাক সেনাদের হাতে ধরা পড়েন। পরদিন মহর আলীর মরদেহ পৌঁছায় শৈলমারী গ্রামে। পাক সেনাদের ভয়ে মাত্র ৫-৬ জন মানুষ একটি পুকুর পাশে কোন রকমেই দাফন করেন তাকে। মহর আলী শহীদ হওয়ার ৩৭ দিনের মাথায় কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার স্ত্রী ও দুই মেয়ে। ভাইয়ের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে আছেন বৃদ্ধা জবেদা খাতুন। ভাই দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, স্বাধীন দেশে তারা বসবাস করছেন এটাই তার গর্ব।কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভাইয়ের কবরটি সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ ছাড়া পরিবারটিকে দেয়া হয়নি কোন সহযোগিতা। ভায়ের স্মৃতিটুকু ধরে রাখতে কবরটি সংরক্ষণের দাবি মহর আলীর স্বজনদের।এ বিষয়ে শহীদের বোন জবেদা খাতুন জানান, ভাই শহীদ হবার পর যখন মরদেহ পৌঁছায়। তখন তাকে চেনার কোন উপায় ছিল না। তার মাথার চুল আর শরীরের পোশাক দেখে শনাক্ত করা হয়। পরে কবর দেয়ার সময়ও কাউকে পাওয়া যায়নি। ভয়ে সবাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। ৭-৮ জন মিলে তাকে কবর দেয়া হয় একটি পুকুর পাড়ে।অথচ সেই কবরটি সংরক্ষণের জন্য আজ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে কবরটি সংরক্ষণের দাবি তার। এ ছাড়া পরিবারের কেউ বেঁচে না থাকায় তাদের খোঁজ রাখেনি কেউ। এ জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।শহীদ মহর আলীর ভাগ্নে আব্দুল মান্নান জানান, মামা শহীদ হয়েছে দেশের জন্য। আজ শান্তিতে বসবাস করতে পারছেন সবাই। এতেই খুশি তারা। মামা শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা। গর্বে বুক ভরে যায় তাদের। এ ছাড়া কোন চাওয়া-পাওয়া নেই তাদের। তবে কবরটি সংরক্ষণের দাবি তার।জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বশীর আহম্মেদ জানান, এসব শহীদ পরিবারের স্বজন যারা বেঁচে আছেন। তাদের সহযোগিতার জন্য বার বার মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা কবরস্থান তৈরির জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ জানান, ডিসেম্বরের মধ্যেই কবরটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পরিবারকে সহযোগিতার পাশাপাশি সড়কের নামকরণের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।এএম/পিআর