আজ ১৯ ডিসেম্বর ঈশ্বরদী হানাদার মুক্ত দিবস। ৩১ জন মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ ও সশস্ত্র প্রতিরোধে আজকের এই দিনে পাক হানাদার মুক্ত হয় ঈশ্বরদী। বেশ কয়েকজন পাকসেনা ও রাজাকার ঈশ্বরদী শহরের অবাঙালি অধ্যুষিত লোকোসেড এলাকায় আত্মগোপন করে থাকায় বাংলাদেশের মানুষ যখন বিজয় উল্লাসে মেতে উঠেছে তখনও ঈশ্বরদী শহরে চলে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ। স্বাধীনতাযুদ্ধে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী ৭নং সেক্টরের অধীনে ছিল। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান। লড়াইয়ের ৯ মাসে ঈশ্বরদীর মাধপুর, খিদিরপুর, দাশুড়িয়ার তেতুলতলা, জয়নগরের ভাড়ইমারী, পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজসহ বিভিন্ন স্থানে পাক সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা।ঈশ্বরদীর ৬শ ৮৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ভারতে ট্রেনিং নিয়ে লড়াই করেন। এর বাইরে ৬৭ জনের কাগজপত্র ত্রুটিপূর্ণ থাকায় তাদের সুবিধা বঞ্চিত রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ মাসে ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকায় অবাঙালি, রাজাকার ও পাকসেনাদের হাতে অনেকে নিহত হয়েছেন। এ ধরনের গণকবর রয়েছে ১০টি। তবে এসব গণকবরের সবগুলোই অরক্ষিত ও অবহেলিত। স্বাধীনতার ৪৫ বছরে আজও জায়গাগুলো সংরক্ষণ করেনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।জুনের শেষে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা ঈশ্বরদী প্রবেশ করে। ২৯ জুন প্রথমে ৩৩ জন বাঘইল গ্রামে এসে পৌঁছে। ৮ জুলাই পাকশি এলাকার টেলিফোনের তার কেটে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তারা। পরবর্তীকালে জয়নগরের বিদ্যুৎ টাওয়ারে শক্তিশালী এক্সপ্লোসিভ নিক্ষেপ করে।এছাড়াও ঈশ্বরদীতে বিভিন্ন শান্তিকমিটির দালাল ও নকশালদের সঙ্গে প্রতিরোধ যুদ্ধ চলতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের। ১৪ আগস্ট দাশুড়িয়া শান্তি কমিটির দালাল মাওলানা আতাউর রহমান নিহত হয়। পাকুড়িয়াতে দূর্ধর্ষ ডাকাত মকছেদ আলীকে গুলি করে হত্যা করে মুক্তিকামী জনতা। এছাড়াও নকমাল ননী সরদারের ছিন্ন মস্তক ছলিমপুর হাটের গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন মুক্তিযোদ্ধারা। এদিকে ৬ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনী প্রবেশের ঘোষণা দিলে কুষ্টিয়া ও যশোর থেকে পালিয়ে আসা পাকিস্তানি সৈন্যরা ট্যাংক কামান অস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে হার্ডিঞ্জ সেতু পার হয়ে ঈশ্বরদী ঘাঁটি গাড়ে। ১৪ ডিসেম্বর ভারতীয় বোমার আঘাতে ১২নং স্প্যানটি বিধ্বস্ত হলে ও বীর যোদ্ধাদের ব্যারিকেডের মুখে ঈশ্বরদীর ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী লোকোসেড এলাকার নাজিমউদ্দিন স্কুলে একত্রিত হতে থাকে পাক সেনাবাহিনী। এদের সঙ্গে মিলিত হতে থাকে নাটোরে ভারতীয় মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পরাজিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও মিলিশিয়া বাহিনী। ইতোমধ্যে ভারতীয় বিগ্রেডিয়ার রাগবীর সিংহ পাল ৪৫৫১ নং বিগ্রেড ঈশ্বরদী পৌঁছে যায়। তারা ঈশ্বরদী ডাকবাংলো, সাড়া মাড়োয়ারি স্কুল মাঠে ক্যাম্প করে। মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে রশিদ তার অধীনস্ত এনসিও সুবেদার নায়েক নুরুল ইসলামকে কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের রেস্টহাউসে মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তাব পাঠান।নুরুল ইসলামকে তারা জানায়, ভারতীয় অফিসার বিগ্রেডিয়ার রাগবীর সিংহ এর সঙ্গে কথা হয়েছে। নাটোর থেকে বিগ্রেডিয়ার মঞ্জুর না আসা পর্যন্ত তারা আত্মসমর্পণ করবেন না। ১৯ ডিসেম্বর ঈশ্বরদী মুক্ত দিবস হলেও ২ দিন সময় চেয়ে ২১ ডিসেম্বর পাক সেনারা ঈশ্বরদী থেকে চলে যায়। আলাউদ্দিন আহমেদ/এফএ/এমএস