দলীয় প্রতীকে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে সাখাওয়াত হোসেন খানের ভরাডুবিতে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে বিএনপি। সরকারের স্বৈরাচারী নীতির কারণে গত কয়েক বছরে বিএনপির জনপ্রিয়তা বেড়েছে বলে দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও নাসিকের ফল দেখে বিস্মিত শীর্ষ নেতারা।এদিকে নির্বাচন চলাকালে নয়াপল্টন কার্যালয়ে তিনবার সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু হচ্ছে বলে জানান দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তার এ দাবির কারণে ফল ঘোষণার পর এখন শক্ত অভিযোগ করতে পারছে না বিএনপি। পরবর্তীতে বাহ্যিকভাবে সুষ্ঠু নির্বাচনের আবহ সৃষ্টি করে আইভিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে এমন অভিযোগ করা হলেও শীর্ষ নেতারা অনেকটাই নিশ্চুপ।সূত্র জানিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচনে নিয়ে কঠোর সমালোচনায় যাচ্ছে না বিএনপি। বিপুল ব্যবধানে পরাজয়ের কারণ জানতেই কাজ করছেন তারা। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের পাশাপাশি কোন কারচুপি হয়েছে কিনা তা নিয়েও অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। এছাড়া নাসিকের ফল জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না বলা হলেও নেতাদের মধ্যে চলছে হাহাকার।জাগো নিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কেন্দ্র থেকে যেসব নেতারা গণসংযোগের জন্য নারায়ণগঞ্জ গেছেন তাদের বেশিরভাগই মিডিয়া সেলে কথা বলেই দায় সেরেছেন। অনেকে আবার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়েই কার্যক্রম শেষ করেছেন। এছাড়া নির্বাচনের দুই দিন আগে সাখাওয়াতের মুখে বিষন্নতার ছাপ নিয়েও সংবাদ প্রকাশ করে জাগো নিউজ। সংবাদে স্থানীয় প্রভাবশালী তিন নেতার অসহযোগিতার বিষয়টি উঠে আসে। সবমিলিয়ে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি প্রার্থীর পরাজয় হবে তা আগেই স্পষ্ট হয়েছিল। তবে নির্বাচনে আইভীর জয়ের কারণ সম্পর্কে বিএনপির নির্বাচন সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব ও ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন কথা বলেননি।বিএনপির এ নেতা মিডিয়া সেলে গণমাধ্যমে নিজের ছবি দেখাতেই ব্যস্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। পাশাপাশি নির্বাচনে প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে যাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তিনিও বেশিরভাগ সময় নারায়ণগঞ্জে পৌঁছান বিকেল ৩টায়। আবার নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে সন্ধ্যা ৫টায় ঢাকায় ফিরেন। তবে অন্যদেরকে দায়িত্ব দিয়ে কাজ করিয়েছেন বলে জানান তিনি।এদিকে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য গঠিত মিডিয়া সেলের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে সমালোচিত বিএনপির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফকে। তিনি গণমাধ্যমের (ঢাকার স্টাফ বা স্থানীয়) কোন প্রতিনিধিদের কাছে প্রচারণার তথ্য জানাননি। এ নিয়ে সাংবাদিকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করতে দেখা গেছে।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গণসংযোগে ৫০ নেতা কাজ করলেও মিডিয়া সেল থেকে প্রায় শতাধিক নেতার নামও পাঠানো হয়। জানতে চাইলে মিডিয়া উইংয়ের দায়িত্ব থাকা দৈনিক দিনকালের সাংবাদিক কামাল জাগো নিউজকে বলেন, এসব তো বুঝেনই ভাই। মোশাররফ ভাইয়ের নির্দেশনায় কাজ করছি। নাম বাড়িয়ে দিতে হয়, কি করবো।আরেকটি সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে ২৭টি ওয়ার্ডে যাদেরকে টাকা দেয়া হয় তারা টাকা নিয়েই অদৃশ্য হন। ওয়ার্ড কমিটির বাকী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ রাখেন। টাকা হাতে পাওয়ার পর স্থানীয় নেতারা লা পাত্তা এমন অভিযাগে কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতাকে জানানো হলে তারা বলেন, তাদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।সাখাওয়াতের নির্বাচনী প্রচারণায় সম্পৃক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, ধানের শীর্ষের জয় না হলেও আইভীপন্থী বিএনপির ১২ কাউন্সিলর জয়ী হয়েছেন। তাদের সঙ্গে সাখাওয়াতের সমন্বয় না থাকায় দলীয় হওয়া স্বত্ত্বেও তারা আইভীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।তার মতে ৩ কারণে সাখাওয়াতের ভরাডুবি হয়েছে। এদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জে আইভী একটা ফ্যাক্টর ছিল। সে তুলণায় বিএনপির প্রার্থী দুর্বল। স্থানীয় নেতারা সাখাওয়াতের পক্ষে ছিল না। আবার সাখাওয়াতের জন্মস্থান মুন্সিগঞ্জ। এছাড়া দলীয় কাউন্সিলর প্রার্থীদের অসহযোগিতা তো রয়েছেই।সাখাওয়াতের প্রতিপক্ষ ছিল সফল মেয়র "আইভী" ও "নৌকা" উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনের দিনও স্থানীয় অনেক নেতার বিরুদ্ধে অসহযোগীতার অভিযোগ উঠে। তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের কথা শুনেননি। কেন্দ্রীয় নেতাদের চেয়ে স্থানীয় নেতাদের বেশি কাজ করা উচিত ছিল বলেও জানান তিনি।সাখাওয়াতের পরাজয় অবিশ্বাস্য উল্লেখ করে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ব্যবধানটা সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরালে কিছু ঘটেছে কিনা তা নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। আর স্থানীয় নেতাদের অসহযোগিতা বিষয়টি দেখা হচ্ছে বলে জানান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে নাসিকে বিএনপি আংশিক সফল বলে জানান মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, এ নির্বাচনকে ভিন্নভাবে দেখি। এর ফল দিয়ে জাতীয় নির্বাচনের বিচার করা যাবে না। বাহ্যিক দিক দিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও ভেতরে কী হয়েছে তা তদন্ত করে জানানো হবে। এমএম/এএইচ/আরআইপি