একসময় চলনবিলের কৃষকরা শুধু ইরি-বোরো এক ফসলি আবাদ করে হাজার হাজার হেক্টর জমি পতিত রাখতেন। কালের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের কৃষি ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটেছে। তারা বিগত দেড় যুগ ধরে ইরি-বোরো, আমন, ভূট্টা, তরমুজ আবাদের পাশাপাশি সরিষার আবাদেও ঝুঁকেছেন। আর তাই এখন সরিষার ফুলে ঢাকা চলনবিলের বিস্তীর্ণ মাঠ। বিলের যে দিকেই তাকাই হলুদ ফুলে চোখ ঝলসে ওঠে। ফুলের সঙ্গে লাখ লাখ মৌমাছির গুঞ্জন মহিত করে তুলেছে কৃষককে। মৌমাছি সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে ব্যস্ত। প্রাকৃতিক কোনো বিপর্যয় না হলে এ বছরও চলনবিলে বাম্পার সরিষার ফলন আশা করছেন কৃষক। কৃষি অফিসের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কৃষকদের পরামর্শ প্রদান করছেন বলে জানিয়েছেন চলনবিলের বিভিন্ন উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা। উপজেলা কৃষি অধিদফতর ও এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরে চলনবিলের ৯ উপজেলায় মোট ৬২হাজার ৩শ ৯৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে তাড়াশে সরিষার আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ৪শ ১০ হেক্টর, রায়গঞ্জে ২ হাজার ৯শ ৯৫ হেক্টর, উল্লাপাড়ায় ১৯ হাজার ৭শ হেক্টর, শাহজাদপুরে ১৪ হাজার ৬শ ২৫ হেক্টর, চাটমোহরে ৫ হাজার ৬শ হেক্টর, ভাঙ্গুড়ায় ৫ হাজার ৬শ ১৫ হেক্টর, গুরুদাসপুরে ১ হাজার ৫শ হেক্টর, সিংড়ায় ১ হাজার ৪শ ৫০ হেক্টর ও আত্রাই উপজেলায় ২ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে।স্থানীয় কৃষি অফিসার ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর চলনবিল এলাকার মাঠে মাঠে সরিষার হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর সরিষা আবাদে চারা বের হবার পর থেকে কিছু কিছু জমিতে পোকা আক্রমণ করছে। তাছাড়া চলনবিলের পানি প্রবাহের মুখে প্রভাশালীদের সুতি জাল ধরায় এ বছর পানি নামতে দেরি হওয়ায় কৃষকরা সরিষার বীজ বোপন করতে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন। তাই গত বছরের তুলনায় এ বছর সরিষার আবাদ অনেক কম হয়েছে বলে তারা জানান। পোকার আক্রমণ থেকে সরিষা রক্ষা করতে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে আগেই বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তারপরেও কিছু কিছু সরিষার জমিতে পোকার আক্রমণে কৃষক অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এ বছর চলনবিলের ৯ উপজেলায় মোট ৬২হাজার ৩শ ৯৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ করা হয়েছে।এলাকার কৃষকরা জানান, কালের প্রেক্ষাপটে আমন ধানের বিকল্প হিসেবে চলনবিলের কৃষকরা বোরো ধানের চাষে ঝুকে পড়ে। চলনবিলের তলদেশে যাদের অবস্থান সেই সব মাঠের কৃষক কখনো সরিষার আবাদ করার কথা ভাবেনি। এখন থেকে ১৫ বছর আগে চলনবিলের কৃষক সমাজ ভাবতে পারেনি এ জমিতে সরিষা ও ভুট্টার চাষ করার কথা। গত কয়েক বছর বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় চলনবিলের মাঠে মাঠে সরিষার আবাদ হয়েছে পুরোদমে। বর্তমানে সরিষার গাছে গাছে হলুদ ফুলের সমাহার। প্রায় ফুলেই মৌমাছি বসে মধূ আহরণ করছে। কৃষক আশা করছেন কোনো রোগ বালাই না হলে এবার চলনবিলে সরিষার বাম্পার ফলন হবে। তাড়াশ উপজেলার সগুনা ইউনিয়নের মাকড়শোন গ্রামের কৃষক রহিজ উদ্দিন জানান, এ বছর তিনি ২৫ বিঘা জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হলে প্রতি বিঘা জমিতে ৬ থেকে ৮ মণ হারে সরিষার ফলন হবে। একই গ্রামের শাহ আলম জানান, বন্যার পানি নামতে দেরি হওয়ায় এবার চলনবিলে সরিষার আবাদ করতে বিলম্ব হলেও গাছের অনুপাতে প্রাকৃতিক কোনো বিপর্যয় না ঘটলে সরিষার ফলন ভাল হবে। দিঘি সগুনা গ্রামের আব্দুল আব্দুর রউফ জানান, সরিষার আবাদের পরই জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা যায়। এতে জমিতে সার কম লাগে। সরিষার পাতা ও শিকড় সবুজ সারের কাজ করে এবং বোরো ধানের ফলনও বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। অল্পসময়ের মধ্যে ২টি ফসল ঘরে তুলতে পারছে কৃষক। চলনবিলে এক সময় বন্যার পানি নামতে দেরি হওয়াতে শুধুমাত্র ইরি-বোরো ধানের আবাদ করতাম। বর্তমানে মাঠে সরিষা, ভুট্টা, বিনাচাষে রসুন, ধনিয়া, গম ও কালিজিরা আবাদ হচ্ছে। ধাপতেতুলিয়া গ্রামের কৃষক আমিন বলেন, সরিষার আবাদ এ অঞ্চলের কৃষককে লাভের মুখ দেখাতে পেরেছে। সরিষার পাশাপাশি এবার ভুট্টার আবাদও হয়েছে ব্যাপক। মাত্র ২ থেকে আড়াই মাসের মধ্যে সরিষা জমি থেকে ঘরে তোলা যায়। সরিষার পাতা ও শিকড় জমিতে জৈব সারের কাজ করে। তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর ইউনিয়নের ভাদাস গ্রামের কৃষক শাহ আলম জানান, চলনবিলে সরিষার চাষ হয় তা ভাবতেই অবাক লাগে। কখনও আমাদের নিচু জমিতে সরিষার আবাদ হয়নি। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আমরা নিচু জমিতে সরিষার আবাদ করছি এবং সরিষা ঘরে তোলার পর সঙ্গে সঙ্গে ওই জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়। গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল করিম বলেন, সরিষার চেয়ে আমার উপজেলায় রসুনের আবাদ বেশি হয়। তাছাড়া গম, রাই, পিঁয়াজ বেশি আবাদ করে এখানকার কৃষকরা। তিনি আরো জানান, শস্য বহুমুখীকরণ করার ফলে সব আবাদই ভাল হয়। মাঠে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকের সঙ্গে কাজ করছেন যাতে কৃষক ফসল ফলিয়ে লাভবান হতে পারে। তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম তাড়াশসহ চলনবিলে এবারও বাম্পার সরিষার ফলন হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। স্বল্পসময়ের মধ্যে কৃষককে একের অধিক ফসল ফলানোর জন্য নানাভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া উপসহকারী কৃষি অফিসারগণ সার্বক্ষণিক মাঠে কৃষকের সঙ্গে কাজ করছেন। যাতে কৃষকের কোনো প্রকার সমস্যার সৃষ্টি না হয়। আমি আশা করছি প্রাকৃতিক কোনো বিপর্যয় না ঘটলে এবার তাড়াশসহ চলনবিলে সরিষা, গম, রসুনের বাম্পার ফলন হবে।এফএ/পিআর