শনিবার সন্ধ্যার আকাশ কালের গহ্বরে নেবে ২০১৬ সালের শেষ সূর্য। রোববার ভোরের সূর্য উদয় ঘটাবে ২০১৭ সালের। বর্ষের বিদায় ও বরণ নিয়ে ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর থেকে ১ জানুয়ারি প্রথম প্রহর পর্যন্ত ‘থার্টি ফাস্ট নাইট’ নিয়ে মাতোয়ারা থাকছে কক্সবাজার। প্রতি বছর নববর্ষের প্রথম রাতে সৈকতে লাখো পর্যটকের বাধ ভাঙা উচ্ছ্বাস থাকে। কিন্তু এবার থার্টিফাস্ট নাইট উপলক্ষ্যে টানা তিনদিন লোকে লোকারণ্য থাকবে সৈকত। একে পুঁজি করে কোনো দৃশ্যমান প্রচারণা ছাড়াই কক্সবাজারে তিন দিনব্যাপী বিচ কার্নিভাল নামের একটি অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের বাদ দিয়ে কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে ‘কার্নিভাল ইভেন্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বিচ কার্নিভালের নামে লুকোচুরি খেলছে। কিন্তু এর আয়োজক হিসেবে নাম রয়েছে পর্যটন কর্পোরেশনের। কি উদ্দেশ্য নিয়ে এ কার্নিভাল সে বিষয়ে অন্ধকারে রাখা হয়েছে গণমাধ্যমসহ পর্যটন সংশ্লিষ্টদেরও। কর্মসূচি সম্পর্কে আয়োজকদের কাছে জানতে ফোন করা হলে, তারা (পর্যটন কর্পোরেশন) এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। মূলত, বিচ কার্নিভাল আয়োজন হয় পর্যটনকে তুলে ধরতে। কিন্তু সৈকতসহ কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন সড়ক ও মোড়ে ব্যানার-ফেস্টুন সাঁটানো ছাড়া কার্নিভালের তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণাও চোখে পড়ে না। এমনকি কার্নিভাল কখনও কোথায় অনুষ্ঠিত হবে এবং আয়োজন সম্পর্কেও বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত জানেন না স্থানীয় সাংবাদিকরা। জানেন না পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সৈকতের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখো গেছে, সৈকতের লাবণী পয়েন্টে গানের কনসার্টের জন্য সুরম্য বিশাল মঞ্চ তৈরি ছাড়া কার্নিভালের মতো বিশাল আয়োজনে অন্য কোন ধরনের অনুষ্ঠানমালার ইভেন্ট চোখে পড়েনি। ফলে বিচ কার্নিভাল আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট নানা মহলে।তাই এ অনুষ্ঠানকে ঘিরে চরম অসন্তোষ রয়েছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। অভিযোগ উঠেছে একটি চক্র থার্টি ফাস্টের লোকারণ্য বিচকে পুঁজি করে কার্নিভালের নামে শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে পর্যটনের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। কক্সবাজারের পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, পর্যটনকে তুলে ধরতে বিচ কার্ণিভাল একটি উলেখযোগ্য প্রকল্প। তবে এটি করা হয়ে থাকে স্বাভাবিকভাবে যে সময় পর্যটকরা কম আসেন তখন। পর্যটনের অফ-সিজনে আন্তর্জাতিকভাবেও এরূপ অনেক আয়োজন হয়ে থাকে। সে সময় পর্যটক আকৃষ্ট করতে বিশেষ ছাড়সহ নানা আয়োজনে পর্যটনকে চাঙা রাখার চেষ্টা করা হয়। এখন পর্যটনের ভরা মৌসুম। বর্ষ বিদায় ও বরণ এবং শীতের আবহে স্বাভাবিকভাবে পর্যটকে ভরপুর রয়েছে কক্সবাজার। বিশেষ দিন ছাড়াও সপ্তাহিক ছুটির দিনেও সমুদ্র শহরের অর্ধ-সহস্রাধিক হোটেল-মোটেল-কটেজ ও গেস্ট হাউসে রুম না পেয়ে রাস্তায় রাত কাটাচ্ছে ভ্রমণ পিপাসুরা। এমন সময়ে সরকারি টাকায় এ আয়োজন হতভম্ব করেছে সবাইকে। কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন এ আয়োজনকে হাস্যকর কৌতুক বলে অবহিত করেছেন। দেশের শীর্ষ অনেক জাতীয় দৈনিক, অনলাইন ও টেলিভিশনে কর্মরত কক্সবাজারের একাধিক সাংবাদিক জানান, বিচ কার্নিভালের বিষয়টি শহরের সড়কের মোড়ে মোড়ে টাঙানো প্লে-বোর্ড থেকে অবহিত হলেও বিষয়টি অজানা। কখন, কে এর উদ্বোধন করছেন বিষয়টি শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত জানানো হয়নি। পর্যটন বিকাশই লক্ষ্য হয়ে থাকলে আয়োজন নিয়ে গোপনীয়তা করার কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেন তারাও।কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজর সিনিয়র সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, কক্সবাজারের পর্যটন বিকাশে চেম্বারসহ পর্যটন সংশ্লিষ্টরা এক যোগে কাজ করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। গতবারের কার্নিভালে সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন চাহিদা মতো প্রশাসনকে সহযোগিতা দিয়েছে। কিন্তু ইদানিং বাণিজ্য মেলা, কার্নিভালসহ জেলার নানা আয়োজনে একটি সাংবাদিক সংগঠনের সম্পৃক্ততার সবার নজরে আসছে। যা শুভনীয় নয়। এতে ব্যক্তি বিশেষ লাভবান হলেও সরকারের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। এসব বিষয়ে জানতে কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেনর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অনুরোধে ঢেঁকি গিলেছে জেলা প্রশাসন। পর্যটন প্রমোটে একটি কার্নিভাল বিশাল ভূমিকা রাখে। সেজন্য সেভাবেই এবং আয়োজন করা দরকার। কিন্তু হঠাৎ পর্যটন কর্পোরেশন কার্নিভালের অনুমতি চেয়েছে আর সমন্বয় রাখতে আমরাও অনুমতি দিয়েছি। এর বাইরে কিছুই তিনি জানেন না উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, আয়োজনের নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে প্রশাসন প্রস্তুত। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের কার্নিভালের আলোকে বলতে হলে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের লোকজনের সঙ্গে আলাপ করা জরুরি ছিল। করা হয়নি এটা একটি ব্যর্থতা। তবু পর্যটনের স্বার্থে জেলা প্রশাসন আন্তরিক।পর্যটন কর্পোরেশন কক্সবাজারের ব্যবস্থাপক ও মোটল শৈবালের ম্যানেজার সৃজন বিকাশ বড়ুয়া বলেন, কার্নিভাল উল্লেখ করা হলেও মূলত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়া বিশেষ কিছুর আয়োজন হচ্ছে না। পর্যটন কর্পোরেশনের আয়োজনের কথা বলা হলেও এটি কার্নিভাল ইভেন্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান আয়োজন করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে বেসরকারি সংগঠন কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এবং প্রচারণাবিহীন এ কার্নিভাল আয়োজন করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের আয়োজনে পরে আরো একটি কার্নিভাল হবে তখন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে করবো। এখন কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়ন ইভেন্টটির সঙ্গে রয়েছে। তারা-ই কর্মসূচি, প্রচার ও অন্য বিষয় দেখভাল করছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। কার্নিভালের বিষয়ে সবার মতো অন্ধকারে রয়েছেন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) এর চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমেদও। তিনি বলেন, পর্যটন প্রমোট করতে সব ধরনের আয়োজন ভালো। তবে গণমাধ্যম ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের অন্ধকারে রেখে আয়োজন করা নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। এআরএ/এমএস