বিশেষ প্রতিবেদন

মনে করেছিলাম বাবা বেঁচে নেই

১০ বছর আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন বাবা। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাইনি। থানায় জিডিও করেছিলাম। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এরপর স্থানীয়ভাবে খোঁজাখুঁজি করে যখন পেলাম না তখন ভাইবোনরা ধরেই নিয়েছিলাম বাবা বুঝি আর বেঁচে নেই। বাবাকে পেয়ে আজ আমরা আনন্দে আত্মহারা। এর চেয়ে খুশীর সংবাদ আর হতে পারে না। যাদের কল্যাণে বাবাকে ফিরে পেয়েছি তাদের ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চাই না। তবে বিশ্বাসের পরিমাণটা কয়েকগুনে বেড়ে গেছে এসব তরুণ-তরুণীর ভালো কাজকর্ম দেখে। আমাদের সমাজে যেমন খারাপ মানুষ আছে তেমনি এসব তরুণ তরুণীর মতো ভালো মানুষও আছে। যাদের কারণে অনেক পরিবারের মুখে হাসি ফুটে।জাগো নিউজের কাছে এভাবেই বাবাকে ফিরে পাবার বর্ণনা দিচ্ছিলেন বৃদ্ধ আব্দুল খালেকের ২য় সন্তান বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, ২৯ ডিসেম্বর ছোট ভাই জয়নাল আবেদিন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমাদের জানায় বাবার মতো একজনের ছবি ফেসবুকে দেখেছে সে। এরপর সে রেজাউল ভাইয়ের ফোন নম্বর দেয়। তারপর কথা হয় রেজাউল ভাইয়ের সঙ্গে। এরপরও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি। যদি সত্যি সত্যি বাবা হয় এটা দেখার জন্য ৫ জানুয়ারি ঢাকায় কুর্মিটোলা হাসপাতালে চলে আসি। এসেই তো হতবাক হয়ে গেছি। যে মানুষটিকে এতদিন মৃত ভেবেছি তিনি এখনও বেঁচে আছেন এ দৃশ্য দেখে আর থেমে থাকতে পারিনি। এরপরই বাড়িতে সবাইকে জানিয়েছি যে, তিনিই আমাদের বাবা। বেলাল হোসেন বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার আমার খালাতো ভাই ফারুক, চাচাতো ভাই জিল্লুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তিন বোন সিফা বেগম, রহিমা বেগম ও শাহিদা বেগম সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণবাগ দেওপাড়া থেকে হাসপাতালে এসেছে। বাবা বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে অনেক স্মৃতিই তিনি ভুলে গেছেন। কিন্তু সন্তানদের তিনি ঠিকই চিনতে পেরেছেন। তিনি বলেন, বাবা আমাদেরকে জড়িয়ে ধরে খুবই কান্না করেছেন। তিনি বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছেন।বেলাল হোসেন আরও বলেন, ১৬ বছর আগে মা মারা যাওয়ার পর বাবা অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর কিছুদিন পর তিনি আরেকটা বিয়ে করেন। সেটি কিছুদিনের মধ্যে সমাপ্তিও ঘটে। এরপর আরও অসহায় হয়ে পড়েন বাবা।তিনি বলেন, বাবা এলাকায় আগে চালের দোকান করতেন। পাশাপাশি কৃষিও করতেন। সম্পত্তির জন্য তাকে বাড়ি থেকে বের করা দেয়া হয়নি। আমরা ৫ ভাই ৪ বোন। বোনগুলোর বিয়ে হয়ে গেছে। ভাইরাও বিবাহিত। তাছাড়া আমাদের তেমন সম্পত্তিও নেই। যে বের করে দেব।তিনি আরও বলেন, হারিয়ে যাওয়ার দিন তিনি দুপুর পর্যন্ত বাড়িতেই ছিলেন। বিকেলের পর থেকেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এলাকায় অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। কিন্তু পাইনি। দীর্ঘদিন হয়ে যাওয়ায় ভেবে নিয়েছিলাম তিনি হয়তো কোথাও মারা গেছেন। যাহোক আজ বাবাকে কাছে পেয়ে আমাদের মাঝে আনন্দের বন্যা বইছে।এ ব্যাপারে আব্দুল খালেককে উদ্ধারকারী রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, বৃদ্ধ চাচা (আব্দুল খালেক) প্রথম অবস্থায় বেশ অসুস্থ ছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন কিছুদিন আগে তিনি বাড়ি থেকে চলে এসেছেন। এরই প্রেক্ষিতে আমরা জিডিতে সেটাই উল্লেখ করেছি। এখন তার স্বজনদের কাছে শুনেছি তিনি ১০ বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিলেন। এ ঘটনায় তৎকালীন সময়ে তারা জিডিও নাকি করেছেন।তিনি আরও বলেন, আমাদের গ্রুপের সদস্যরা সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানা পুলিশের ওসির সঙ্গে কথা বলবেন। এছাড়াও কয়েকজন তাদের এলাকায় যাবেন। স্বজনদের কথা সঙ্গে যদি কথা মিল পাওয়া যায় তাহলে আমরা আজ (শুক্রবার) বিকেলেই আব্দুল খালেককে হস্তান্তর করা হবে।রেজাউল বলেন, বৃদ্ধ চাচা বার বার অনুরোধ করছেন তার সন্তানদের যেন কিছু না বলি। তিনি সন্তানের চিনতে পেরেছেন এবং তাদের সঙ্গে বাড়ি যেতে চাচ্ছেন।এ ব্যাপারে ডিএসই গ্রুপের অ্যাডমিন জেবিন ইসলাম ও ইমন খান জাগো নিউজকে বলেন, বৃদ্ধ বাবার সেবায় মূলত আমরা জড়িত ছিলাম। আমাদের সদস্যরা ডাক্তার দেখানো থেকে শুরু করে এমন কোনো কাজ নেই যা করেন নি। এ কাজে বিপ্লব, তিন্নী, শিফা, সাজিদ, সাফাসহ অনেকে অনেক কষ্ট করেছেন। বিশেষ কৃতজ্ঞতা ইমরান ভাইয়ের প্রতি।তিনি আরও বলেন, বৃদ্ধ বাবাকে তার সন্তানকে নিয়ে গেলে আমাদের কিছু করার নেই। তবে উনার যেন সঠিক দেখভাল করেন এটাই আমাদের চাওয়া। কারণ গত কয়েকদিনে আমরা যেমন উনার কাছে সন্তানের মতো ছিলাম। তিনিও ছিলেন আমাদের সবার বাবার মতো।প্রসঙ্গত, গত ২৭ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশনে টিকিট কাটতে যান রেজাউল করিম নামে এক যুবক। সেখানে তিনি দেখতে পান এক বৃদ্ধ কান্না করছেন। পরদিন ২৮ ডিসেম্বর তিনি আবারো সেখানে গেলে একই চিত্র দেখতে পান। এরপর তিনি আব্দুল খালেকের সঙ্গে কথা বলেন এবং তার কিছু ছবি তুলে রাতে ফেসবুকে পোস্ট করেন। পরদিন ২৯ ডিসেম্বর বৃদ্ধকে রেলস্টেশন থেকে উদ্ধার করে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করেন। এমএএস/পিআর