দেশজুড়ে

বেনাপোল বন্দরে ম্যানুয়াল ক্লিয়ারেন্স : অযথা নষ্ট হচ্ছে সময়

দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন ভারত থেকে লাখ লাখ টন মালামাল নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে শত শত ভারতীয় ট্রাক। আমদানি-রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাস্টমসহ সকল পর্যায়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে কার্যক্রম চললেও বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সকল কার্যক্রম চলছে মান্ধাতার আমলের হাতে কলমে লিখে। খোদ বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণেই অটোমোশন চালু হচ্ছে না। ম্যানুয়াল ক্লিয়ারেন্স পদ্ধতিতে কার্গো পণ্য তদারকি করার ফলে দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোলে পণ্য খালাসে অযথা সময় নষ্ট হয়। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমদানি-রফতানি এবং সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর। এছাড়া এ পুরাতন পদ্ধতিকে পুঁজি করে বন্দরে গড়ে উঠেছে একটি অসাধু চক্র। যাদের কারণে সরকার প্রতিবছরই বঞ্চিত হচ্ছে বড় ধরনের রাজস্ব থেকে। গত অক্টোবরে আগুন লেগে কত টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে ও এর কাগজপত্র পুড়ে যাওয়ায় বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই হিসেব মিলাতে কাস্টমসের কাছে ধর্ণা দিচ্ছে। অথচ এসব পণ্যের তালিকা কম্পিউটারে থাকলে এক ক্লিকেই সব পাওয়া যেত। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের প্রধান বন্দরগুলোতে ইতোমধ্যে অটোমোশন পদ্ধতিতে সকল কার্যক্রম পরিচালিত হলেও স্থলবন্দর বেনাপোলে এখনো অটোমোশন পদ্ধতির ছোঁয়া লাগেনি। অনেক কর্মকর্তা এখনো অটোমোশন পদ্ধতি কী সেটিও জানেন না। এর ফলে আমদানি-রফতানিসহ মালামাল খালাসে প্রতিদিন অতিরিক্ত সময়ের অপচয় ঘটছে। পাশাপাশি আশানুরুপ সেবা পাচ্ছে না বন্দর ব্যবহারীরা। অথচ আশানুরুপ সেবা না দিয়েও প্রতিবছর শতকরা ৫ ভাগ বন্দরের চার্জ আদায় করে নিচ্ছেন বন্দর ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে। এদিকে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ অটোমোশন পদ্ধতি চালু না করার কারণে কাস্টমসের সঙ্গে সমন্বয় করাও সম্ভব হচ্ছে না। অথচ কাস্টমসে বেশ কয়েক বছর আগেই কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে অটোমোশন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। বন্দরে অটোমোশন পদ্ধতি চালু না হওয়ায় সেটিও কোনো কাজে আসছে না। ফলে ব্যবসায়ীদের এনালগ পদ্ধতিতে বন্দরে কাগজপত্র সাবমিট করতে হচ্ছে। অটোমোশন পদ্ধতি চালু না হওয়ার কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন ভারত থেকে বন্দরে কী পরিমাণে মালামাল ঢুকছে, মালামালের সঠিক বর্ণনা, মালামালের পরিমাণ, কোন মাল কত নম্বর শেডে সংরক্ষিত হচ্ছে তার কোনো সঠিক হিসাব দিতে পারছে না। এসব জানতে বা দেখতে খাতাপত্র দেখে বলা হয়। যার ফলে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী তাদের অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছে হর হামেশায়। এ কারণে অন্যান্য বন্দরের তুলনায় শুল্ক ফাঁকির প্রবণতাও দিন দিন বাড়ছে বহুগুনে। ফলে সরকার এ বন্দর থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বেনাপোল বন্দরের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে দ্রুত কার্গো পণ্য আমদানি-রফতানিতে পুরাতন ক্লিয়ারেন্স পদ্ধতিকে অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ওই গবেষণাপত্রে। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফআইসি) এর সহায়তায় ‘বাংলাদেশ টাইম রিলিজ স্টাডি (টিআরএস)’ শীর্ষক এ গবেষণা পরিচালনা করে বেনাপোল বন্দর কাস্টমস হাউজ। এছাড়া ওরজ-কোয়েস্ট রিসার্চ লি. (ওর-কোয়েস্ট) এ গবেষণায় সার্বিক সহযোগিতা করেছে। গবেষণায় ব্যবসায়ীদের এ পদ্ধতি থেকে মুক্তি ও ঝুঁকি মুক্ত করতে ইলেট্রনিক পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত এবং আরামে ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টিতে সুপারিশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের বৃহত্তম এ স্থলবন্দরের অবাঞ্চিত সময় নষ্ট বিষয়ে স্বল্প, মধ্য অথবা দীর্ঘ মেয়াদী পদক্ষেপ নিতে বলেছে। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে পণ্য ঘোষণা, প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শতভাগ আরামদায়ক পদ্ধতি গ্রহণে পাইলট প্রোগ্রাম নিতেও বলা হয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য কাস্টমস পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিটের ক্ষেত্রে জোর দেওয়া উচিত। ঝুঁকি এড়াতে কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে অন্যান্য সংস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করতে সুপারিশ করা হয়েছে। পণ্য পরীক্ষার ক্ষেত্রে সময় নষ্টের বিষয়টি চিহ্নিত করে সময় বাঁচাতে সব সংস্থার মধ্যে উন্নত যোগাযোগের মাধ্যমে বন্দর পরিচালনা করা যেতে পারে।এ প্রতিবেদন অনুসারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড খুব শিগগিরই এ বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রফতানি বাধা দূর করার জন্য ব্যবস্থা নেবে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে। বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) আব্দুল জলিল জানান, বেনাপোল স্থলবন্দরকে ডিজিটাল করতে ঢাকাস্থ প্রধান কার্যালয়ে কাজ চলছে। অচিরেই বেনাপোল বন্দরকে ডিজিটালে রুপান্তরিত করা হবে। এর ফলে বন্দরের গতিশীলতা অনেক বেড়ে যাবে বলে তিনি জানান। এ ব্যাপারে বেনাপোল কাস্টমস হাউজের কমিশনার মো. শত্তকাত হোসেন জানান, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বৈঠক হলেও বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরের প্রধান কার্যালয়ের অজুহাতে সময় ক্ষেপণ করছেন। পুরো কাস্টমস হাউজকে অটোমোশন এর আওতায় আনা হলেও বন্দরের কারণে আমাদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জামাল হোসেন/এফএ/এমএস