ধর্ম ও ধর্মীয় বিশ্বাস এক অভিন্ন। অর্থাৎ নারী-পুরুষ দুজনই বৌদ্ধ ধর্মানুসারী। কিন্তু ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে। কেন স্বজাতি রেখে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ছেলেকে বিয়ে করলেন, কেবল সেই অপরাধে টানা দুই মাস ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন রাঙ্গামাটির এক পাহাড়ি মেয়ে। তার নাম জোসনা চাকমা (২২)। সম্প্রতি জেলার নানিয়ারচর এলাকায় এমন লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে।নানিয়ারচর উপজেলার নানাকুরুম নামক দুর্গম পাহাড়ি গ্রামবাসী জহর লাল চাকমা ও রত্না চাকমার মেয়ে জোসনা চাকমা বলেন, ঘটনাটির সূত্রপাত গত বছর ১৮ নভেম্বর। ওই দিন দুপুরের দিকে বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। তারা নিজেদের ইউপিডিএফের লোক বলে পরিচয় দেয়। এরপর গলায় শেকল বেঁধে বদলিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আটকে রাখা হয় তাকে। এভাবে টানা প্রায় দুই মাস ধরে আটকে রেখে তার ওপর বেধড়ক মারধর ও অমানসিক নির্যাতন চালায় স্বগোত্রের দুর্বৃত্তরা। শেষে সুযোগ বোঝে জীবনবাজী রেখে পালিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন তিনি। গভীর রাতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন রাঙামাটি সদরের কুতুকছড়ি সেনাক্যাম্পে। বৃহস্পতিবার সকালে রাঙামাটি প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন জোসনা চাকমা। এসময় তার স্বামী অপু চন্দ্র সিংহ উপস্থিত ছিলেন।ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জোসনা চাকমা বলেন, তিনি ২০০৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর চলে যান চট্টগ্রামে। সেখানে তিনি এক গার্মেন্টসে চাকরি নেন। থাকতেন চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকায়। সেখানে পরিচয় ঘটে কুমিল্লার আলীশ্বর গ্রামের বাসিন্দা স্বপন চন্দ্র সিংহ ও গীতারাণী সিংহের ছেলে অপু চন্দ্র সিংহের সঙ্গে। ধর্মে তারাও বৌদ্ধ। অপু চন্দ্র সিংহ চট্টগ্রামে টেলিটক কাস্টমার কেয়ারে চাকরি করতেন। এক পর্যায়ে একে অপরের মধ্যে ভালো লাগা আর মন দেয়া-নেয়া হয়। এর শেষ পরিণতির এক পর্যায়ে গত বছর ১৮ জুলাই চট্টগ্রামে আদালতের মাধ্যমে বিয়ের হলফনামা সম্পাদন করি। পাশাপাশি ধর্মীয় রীতিমতেও তা সম্পাদন করি। এরপর স্বামী-স্ত্রী চট্টগ্রামে বসবাসের কয়েক মাস পর বাবা-মার সম্মতি ও পরামর্শে সামাজিকভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে দুইজনেই নানিয়ারচরের নানাকুরুমের গ্রামের বাড়ি যায়।বাবা-মা গত বছর ১৮ নভেম্বর বিয়ের আয়োজন করেন। দুপুরের দিকে অতর্কিতভাবে বিয়ে বাড়িতে হানা দেয় অস্ত্রধারী চার যুবক। তারা সবাই উপজাতি। বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে বর-কনে দুইজনকেই অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। তখন তারা নিজেদের ইউপিডিএফের লোক পরিচয় দেয়। অর্ধেক রাস্তা যাবার পর আমার বর অপু চন্দ্র সিংহকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে কিছুক্ষণ পর পাঠানোর কথা বলা হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আমাকে গলায় শেকল দিয়ে বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ওই সময় নিজের জাতির ছেলে রেখে কেন বাঙালি বিয়ে করেছি, সেই অপরাধে আমার ওপর দিনরাত বেদম মারধর ও অমানুষিক নির্যাতন চালায় দুর্বৃত্তরা। এভাবে প্রথমে রাঙামাটি সদরের কুতুবছড়ির ডলুছড়ির কালাবিচা চাকমার বাড়িতে তিন সপ্তাহ, চোংড়াছড়ির শান্তি চাকমার বাড়িতে প্রায় এক সপ্তাহের অধিক এবং শেষে শুকরছড়ির আনন্দ মণি চাকমার বাড়িতে তিন সপ্তাহ রাখা হয়েছে। পরে অবশ্য শেকলের বাঁধা খুলে দেয়া হয়। এর মধ্যে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক ডিভোর্স লেটারে আমার স্বাক্ষর নেয়া হয় এবং অন্যের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার জন্য ঠিকঠাক করা হয়। সর্বশেষ জীবনবাজি রেখে আনন্দ মণি চাকমার বাড়ি থেকে ১৬ জানুয়ারি গভীর রাতে পালিয়ে এসে কুতুবছড়ি সেনাক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছি। পরদিন নানিয়ারচর থানায় পুলিশের নিরাপত্তা হেফাজতে পাঠান সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ১৮ জানুয়ারি রাঙামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির করে আমার ইচ্ছাতে স্বামীর কাছে হস্তান্তর করেন আদালত। তাকে বাঁচাতে সর্বাত্মক সহায়তা দেয়ায় আদালত, সেনাবাহিনী ও পুলিশের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জোসনা চাকমা। সংবাদ সম্মেলনে অপু চন্দ্র সিংহ ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে বলেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ সহায়তা না করলে আমার স্ত্রীকে জীবিত ফিরে আসার কোনো সুযোগ ছিল না। তিনি ঘটনার জন্য তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন।সুশীল প্রসাদ চাকমা/এআরএ/এমএস