দেশজুড়ে

অস্তিত্বহীন প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের সুপারিশ

কুড়িগ্রামে অস্তিত্বহীন স্কুলের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থী নেই, জমি নেই, ঘর নেই তবে আছে কমিটি ও স্কুল। সেটি শুধুমাত্র কাগজে-কলমে।সকল বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণে সরকারি আশ্বাসে শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীর প্রত্যক্ষ মদদে স্থানীয় প্রভাবশালীরা স্কুল বাণিজ্য খুলে বসেছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের দুর্নীতির ফলে গড়ে উঠেছে অনেক অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান। সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল বাঁশঝাড়, চারপাশে গাছের সারি। এক কোনায় পারিবারিক শৌচাগার। বাস্তবে এমন হলেও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের খাতা-কলমে চলমান স্কুল।পূর্ব জকারহাট নামে পশ্চিম নওদাবস বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।স্কুলটি জাতীয়করণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে শিক্ষা কর্মকর্তা। অথচ ওই স্থানে কোনো স্কুল ছিল না গত ২০ বছরে। ২০-২২ বছর আগে ওই স্থানে একটি পারিবারিক স্কুল ছিল স্থানীয় বিনোদ ও বীরেন চন্দ্রের পিতার। পরে পারিবারিক স্কুলটি ভেঙ্গে ফেলে সেখানে বাড়ি তৈরি করেন তারা। প্রায় ১৫-১৬ বছর আগে বাড়ি ভেঙ্গে জায়গাটি বিক্রি করেন কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের কাছে। সেই থেকে ভোগ দখল করে আসছেন ক্রেতা কৃষ্ণচন্দ্র।জমির পূর্বের মালিকের ছেলে বীরেন চন্দ্র স্কুলটি প্রতিষ্ঠার তদবীর করছেন। কথা হয় বড় ভাই বিনোদ চন্দ্রের সঙ্গে। তিনি পূর্ব চন্দ্রখানা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি জানান, ওইখানে স্কুল নেই ঠিক আছে। জাতীয়করণ হলে করা হবে। সব স্কুল এভাবে হচ্ছে। অন্যের জমিতে স্কুল প্রসঙ্গে বলেন, অনেকদিন আগে জায়গাটি স্কুলের নামে দেয়া হয়েছিল। তারপর বিক্রি করা হয়। স্কুল সরকারি হলে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তারা ছেড়ে দিয়ে অন্য খানে জমি নেবে। তবে এ কথায় রাজী নন বলে জানান জমির মালিক রাশ চন্দ্রের ছেলে কৃষ্ণ চন্দ্র।তিনি বলেন, অনেক বছর হলো জমি কিনেছি। বাঁশ লাগিয়েছি। এখন ফেরত দেব না। একই কথা বলেন তার ভাই অনিল চন্দ্র রায়, ছেলে কৈলাস চন্দ্র রায়সহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস ছামাদ বলেন, ওই নামে কোনো বিদ্যালয় এখানে আছে বলে আমার জানা নেই। ফুলবাড়ী উপজেলায় নতুন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণে এমন সব ঘটনাই ঘটেছে। এমন কয়েকটি চিহ্নহীন বিদ্যালয়কে সচল দেখিয়ে জাতীয়করণের অনুমোদন দিয়েছে উপজেলা শিক্ষা অফিস।শিক্ষা অফিস জানায়, মন্ত্রণালয়ের চিঠির প্রেক্ষিতে ফুলবাড়ী উপজেলায় ১১টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের জন্য তথ্য পাঠানো হয়েছে গেল বছরের ৯ই আগস্ট। অপেক্ষমান রয়েছে আরও ৬টি। এসব বিদ্যালয়ে জাতীয়করণে চলছে তুঘলকি কারবার। ১১টির মধ্যে একটিও সচল বিদ্যালয় নেই। সরেজমিনে কয়েকটি স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে, উত্তর নজর মামুদ, সুজানের কুঠি আদর্শ, সর্দারপাড়া পশ্চিম খোচাবাড়ী আবাসন, খোচাবাড়ী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিজস্ব অবকাঠামো নেই। এসব স্কুলের নামে জমি আদৌ আছে কিনা তাও কেউ জানে না।সম্প্রতি টিনশেড ঘর করা হয়েছে। দরজা-জানালা নেই। নেই চেয়ার টেবিল বা আসবাবপত্র। শিক্ষার্থী নেই। তবে কাগজ-কলমে শিক্ষক রয়েছে। ব্যাকডেটে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এমন অবস্থায় হতবাক উপজেলার অনেকে। শিক্ষা অফিসের জাতীকরণ বাণিজ্যের অভিযোগও অনেকের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন। শিক্ষা অফিস টাকার অফিস। টাকা হলে বাঁশবাড়িও স্কুল বলা যায়।উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার অধিকারী বলেন, আমার পক্ষ থেকে কোনো স্কুলের সুপারিশ করা হয়নি। মন্ত্রণালয়, স্থানীয় এমপির ডিও লেটার, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, ইউএনও পাঠানো চিঠির আলোকে কাজ হয়েছে। তবে কিছু স্কুল এখনো নতুন বলে তিনি স্বীকার করেন।অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০৩ সালে উপজেলার ওকড়াকান্দা গ্রামের দারাজ উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি ৩৩ শতাংশ জমি ওকড়াকান্দা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে ওয়াকফো করেন। এরইমধ্যে জমিদাতা দারাজ উদ্দিনের মৃত্যু হলে ভাগবাটোয়ারা হয়ে যায় পৈত্রিক সম্পত্তি। ফলে স্কুলে দানকৃত ওই ৩৩ শতাংশ জমি দারাজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুস সালামের ভাগে পড়ে। সম্প্রতি ওই স্কুলের নামে মিলন মিয়া (রোল নং ১০৬৮), তোহা মিয়া (রোল নং ১০৬৯), মনি আক্তার (রোল নং ১০৭০), মিতা পারভীন (রোল নং ১০৭১) ও দিশা মনি (রোল নং ১০৭২) নামের ৫ পরীক্ষার্থী শৌলমারী এমআর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে ২০১৬সালের পিএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।ওই পরীক্ষার্থীরা এমআর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে স্বীকার করেছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমান। জমির মালিক আব্দুস সালাম খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, কে বা কারা গোপনে কাগজ-কলমে স্কুলটি জারি রেখেছেন। আর এ কাজে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করছে রৌমারী উপজেলা শিক্ষা অফিসের শিক্ষা কর্মকর্তা কর্মচারীরা। এ নিয়ে ২০১৬ সালের ২৪ নভেম্বর তিনি রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়, ওই জায়গায় স্কুলের কোনো অস্তিত্ব নেই। শিক্ষা অফিসসহ জড়িতদের দৃষ্টান্ত শাস্তিও দাবি করেন তিনি।স্কুল প্রসঙ্গে জমির মালিক আব্দুস ছালাম জানান, আমার বাবা স্কুল ঘর তোলার জন্য জমি দান করলেও আদৌও এই জমিতে কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়নি। আমি ৪-৫ বছর আগে গাছ রোপন করেছি। পরিবার নিয়ে ঘর তুলে বসবাস করছি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুল হক জানান, জেলায় ২০১৬ সালে ৭৬টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করার জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে সুপারিশ করা হলেও জেলা শিক্ষা কমিটিতে সবগুলোকে জাতীয়করণে অনুমোদন না দেবার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। তবে তিনি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের গাফিলতির বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি।এমআরএম/পিআর