পাল্টে যাচ্ছে ভাঙন কবলিত সিরাজগঞ্জ যমুনা চরের অর্থনীতি। জেগে ওঠা বিশাল চরে গড়ে উঠেছে বসতি ও গো-খামার। শুষ্ক মৌসুমে বিশাল আকৃতির এই চরে চাষাবাদ করা হচ্ছে ধান, পাট, কাউন, তিল, বাদামসহ নানা শাকসবজি। চরের বিস্তৃতি বাড়ার পাশাপাশি তা স্থায়ী চরে পরিণত হয়েছে। জনবসতিহীন দূর্গম চরে এখন বসেছে প্রাণের মেলা। চরে মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেরই রয়েছে মহিষ ও গরুর খামার। গবাদি পশুর খামার করে পাল্টে যাচ্ছে সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার চরাঞ্চলের অর্থনীতি। গবাদি পশু লালন পালনে বিপুল সম্ভাবনাময় সিরাজগঞ্জের চর অঞ্চলে একটি পরিকল্পনা নিয়ে যাত্রা শুরু করলে সম্ভাবনাটি বাস্তবে রূপ নেবে। অভাব ঘুচবে অভাবী চরবাসীর। উৎপাদন বহুগুণে বাড়বে দুগ্ধ কিংবা দুগ্ধজাত সামগ্রীর। অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটবে চর জুড়ে। সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, ভাঙন কবলিত যমুনা নদীর চরগুলো ক্রমশ আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। আর এসব জমিতে আবাদ হচ্ছে নানা অর্থকরী ফসল। যমুনা সেতুকে ঘিরে গত কয়েক বছরে খণ্ড খণ্ড আকৃতির বড় বড় চর জেগেছে। এসব চরে অনেক মানুষের মাথা গোজার ঠাঁই করে দিলেও বর্ষা মৌসুমে পড়তে হয় ভয়াবহ ভাঙনের ঝুঁকিতে। বর্তমানে চরে বসতি স্থাপন করে তাতে বসবাস করছে ভূমিহীন মানুষেরা। বাড়ির আঙিনায় মাথা উঁচু করলেই দেখা যায় দেশের সর্ববৃহৎ যমুনা সেতুটি। চোখ ধাঁধানো বর্ণিল সবুজ ফসলের সরব উপস্থিতির কারণে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ এবং জামালপুর জেলার অনেক কৃষক তাদের গরুগুলো চরাতে যমুনার চরে উপস্থিত হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে একটি করে গো-খামার গড়ে উঠেছে। গো-খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় এসব কৃষক তাদের শত শত গরু-বাছুর নিয়ে এসেছেন চরে। পলি মাটির আস্তরণে জেগে ওঠা ঘাস, বিচালি খাইয়ে তারা গরু গুলোকে লালন করছেন। এক সময়ে যমুনা নদীর পানির প্রাচুর্য্যতা থাকলেও ক্রমশ তাতে ভাটা পড়েছে। এখন সেতুর নিচে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর। যেসব গ্রাম একদিন বিলীন হয়ে গিয়েছিল সেখানে পুনরায় সেই নামেই নতুন করে গড়ে উঠেছে বসতি। তবে বসতি গড়ে উঠলেও চরে বসবাসরত ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য নেই কোনো ভালো স্কুল-মাদরাসা। এ কারণে ছেলেমেয়েরা সংসার ও কৃষি কাজে বাবা-মার সঙ্গী হচ্ছেন। যমুনার বুক এখন বসবাসের উপযোগী। ফলে প্রতিনিয়ত এই চরে বাড়ছে বসতি। যমুনা সেতুর উপর থেকে দেখা যাবে বাঁশ-খড়ের সারি সারি বাড়ি। বাপ-দাদার ভিটা মাটি ফিরে পেয়ে ভীষণ খুশি এসব পরিবার। জমি ধরে রাখতে প্রাণান্তর চেষ্টাও আছে তাদের। যমুনা নদীর বিভিন্ন চরে জেগে ওঠা কয়েকটি গ্রাম ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে। শুধু বসতি নয়, যমুনার চর এখন ব্যবসায়ীক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। বিশেষ করে যমুনা নদীর নাটুয়ারপাড়া চর ইতোমধ্যেই মরিচের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। লাখ লাখ টাকার মরিচ বেচাকেনা হয় এখানে। চরগুলোতে গো-খামার এবং ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠলেও তাদের জন্য নেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। চরের খামার মালিক জহির উদ্দীন ও মানিক আখতার জানান, গো খাদ্যের দাম এখন অনেক বেশি। ধানসহ নানা ফসলের চাষাবাদ হচ্ছে চরে। ঘাস বিচালিও রয়েছে প্রচুর। এগুলো টাকা দিয়ে কিনতে হয় না। যে কারণে আমার গরুগুলো নিয়ে চরে খামার গড়ে তুলেছি। আবার পানি আসার আগেই সেগুলো কিছুদিনের জন্য অন্যত্র নিয়ে যাব। গো খাদ্যের জন্য নগদ টাকা খরচ হয় না বলে গরু বিক্রি করে অনেক টাকা লাভ করা যায় বলেও জানালেন তারা।যমুনার চর দোগাছীর চরের কৃষক সোলাম হোসেন, আতিকুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন ও আতিয়ার জানান, ক্রমশ এ চরটির পরিমাণ বাড়ছে। পলি পড়ে ফসল চাষে উপযোগী হচ্ছে তাদের এসব জমি। প্রায় ২৫ বছর আগে তাদের পূর্ব পুরুষের জমিতে তারা নতুন উদ্যমে চাষ শুরু করেছেন। কৃষক মকবুল প্রামাণিক জানান, বর্তমানে জেলার কাজীপুর থেকে চৌহালী উপজেলা পর্যন্ত যমুনা নদী জুড়ে ছোট বড় এমন অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। অধিকাংশ জমিতে চাষ হচ্ছে নানা ফসল। আর চরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে গড়ে ওঠেছে গো-খামার। এসব খামারে গরু পুষতে বেশি খরচ হয় না। সকালে গরুগুলো চরে চরে ছেড়ে দিয়ে যায় খামারীরা। সারাদিন চরের ঘাস বিচালী খেয়ে বেড়ায় গরুগুলো। বিকেলে খামারিরা গরুগুলো বাড়ি নিয়ে যায়। এতে খরচ কম হওয়ায় লাভবান হচ্ছেন খামারিরা।যমুনা নদীর কাওয়াকোলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদত হোসেন ঠাণ্ডু জানান, যমুনা নদীতে ড্রেজিং করার ফলে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় নদীর ভাঙন অনেকটাই কমে এসেছে। এ কারণে নদীতে জেগে উঠেছে বিশাল বিশাল চর। এসব চরে এখন বসবাস করছে হাজার হাজার পরিবার। তারা চরের জমিতে চাষাবাদের পাশাপাশি গো খামার গড়ে তুলেছেন। যমুনার চর থেকে কোরবানীর ঈদের আগে প্রচুর গরু বিক্রি হয়। চরের খামারিরা বেশি লাভবান হচ্ছেন কারণ গরু পুষতে তাদের বেশি খবর বহন করতে হয় না। এ কারণে প্রতিনিয়তই চরে গো খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি পচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় যমুনা নদীর চরের অর্থনীতি পাল্টে যাবে।ইউসুফ দেওয়ান রাজু/এফএ/পিআর