কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন থেকে চিলমারী উপজেলা রক্ষার জন্য ব্রহ্মপুত্র ডান তীর রক্ষা ফ্যাস-টু (২) নামক ২৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬ কি.মি বাঁধে ব্লক ফেলার প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। কিন্তু ব্লক তৈরিতে মানা হচ্ছে না সরকারের দেয়া নিয়মাবলী। অভিযোগ উঠেছে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এতে করে উপজেলা রক্ষায় এ প্রকল্প কতটা সুফল দেবে তা নিয়ে এলাকাবাসীর মাঝে সংশয় দেখা দিয়েছে।পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সাল থেকে শুরু হয় চিলমারী রক্ষা প্রকল্প ব্রহ্মপুত্র ডান তীর রক্ষা ফ্যাস-টু (২)। ২০১৩ সালে প্রথম টেন্ডার ছয় কোটি টাকা, ২০১৫ সালে দ্বিতীয় দফা টেন্ডারে ৭৭ কোটি টাকা এবং ২০১৬ সালে তুতীয় দফায় ১৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫কি.মি. বাঁধে ব্লক ফেলার কাজ হাতে নেয় সরকার। ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙন ঠেকানোর জন্য সর্বশেষ ২০১৬ সালে ৫-৬ কি.মি. বাঁধের পরিধি বাড়িয়ে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২৫৬ কোটি টাকা। উলিপুর উপজেলা থেকে চিলমারী পর্যন্ত ছয় হাজার ৪৫০ মিটারে ব্লক, ব্লক ম্যাসিং, ডাম্পিং এবং জিওব্যাগ ডাম্পিং করার কাজ এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। এরমধ্যে অনন্তপুর বাঁধে এক কি.মি., কাঁচকল বাঁধে তিন কি.মি. এবং চিলমারী বন্দরে দুই কি.মি. বাঁধ ধরা হয়। ২০১৬ সালে ৯টি প্যাকেজে ৯টি ঠিকাদারকে এই কাজ দেয়া হয়।এরমধ্যে বেলাল হোসেনের দু’টি প্রতিষ্ঠান র্যা র আরসি, টিআইএসবি জেভি কে প্রায় ১৫ কোটি টাকা, সুশেনের রূপান্তর জেভি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা, লিয়াকত আলীর এলএলটিজেভি প্রায় সাত কোটি টাকা, আব্দুল মান্নানের এমএ এন্টারপ্রাইজ প্রতিষ্ঠানকে প্রায় আট কোটি টাকা, মাহফুজার রহমানের এমআরসি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় সাত কোটি টাকা, খায়রুল কবির রানার প্রতিষ্ঠানকে প্রায় আট কোটি টাকা, কেএসএ ইমদাদুল হকের প্রতিষ্ঠানকে প্রায় সাত কোটি টাকা এবং খন্দকার শাহিন আহমেদের প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১৩ কোটি টাকার কাজ দেয়া হয়। স্ব-স্ব নামে কাজ পেলেও এইসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বিভিন্ন সাব ঠিকাদার দিয়ে চালাচ্ছে ব্লক তৈরির কাজ। স্থানীয় সাব ঠিকাদাররা ব্লক তৈরিতে সরকারের নিয়মের তোয়াক্কা না করে স্থানীয় বালু ও নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করছেন। ইতোমধ্যে অনেক জায়গায় ব্লক তৈরি ও ফেলার কাজ শেষ হয়েছে। প্রায় ১২ লাখ ব্লক তৈরি হবে পাঁচ ক্যাটাগরিতে। এরমধ্যে ব্লক সাইজ হবে ৩৫×৩৫×৩৫ সে.মি. , ৪০×৪০×২০ সে.মি. , ৪০×৪০×৪০ সে.মি. , ৪৫×৪৫×৪৫ সে.মি. , ৫০×৫০×৫০ সে.মি.। ব্লকে পাথরের সাইজ হবে ৪০ এমএম আর বালু হবে মোটা ২ দশমিক ৫ এফএম মাপ। বিধি মোতাবেক প্রতি ব্লক তৈরির নিয়ম ছয়টি পাথর, তিনটি মোটা বালু, এক বস্তা সিমেন্ট দেয়ার কথা থাকলেও ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের তিন বালতি পাথর, ৯ থেকে ১৩ বালতি স্থানীয় ১ দশমিক ২০ এফএম মাপের বালু আর এক বস্তা সিমেন্ট। ব্লক তৈরির কাজে নিয়োজিত অনেক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান ব্লকে অনিয়মের কথা স্বীকার করে বলেন, বাহে হামরা এটে কাজ করি খাই। হামাক যেমন করি কাজ করতে কয়, তেমনি করে কাজ করি। স্থানীয় বাসিন্দা মহিবুল, রমজান, রমিছা বেওয়া জানান, সরকার এই চিলমারী উপজেলাকে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে এই অঞ্চলের মানুষ খুব খুশি। কিন্তু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো কাজের বিবরণী উল্লেখ করে কোনো সাইন বোর্ড না দেয়ায় আমরা বলতেও পারি না কাজের গুণগত মান ঠিক হচ্ছে কি না। ভাঙন ঠেকানোর জন্য প্রতিদিন দেখি কাজ চলছে। ম্যানেজার বা ঠিকাদারের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলেও তারা বলে ফাও মাথা ঘামানোর দরকার নেই।বিনিময় কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার হারুন মিয়া দাবি করেন, কাজের বর্ণনাযুক্ত সাইনবোর্ড না থাকলেও কাজের মান সঠিক রয়েছে। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম হাবীব দুলাল বলেন, চিলমারী রক্ষার দাবি উপজেলাবাসীর দীর্ঘদিনের। সরকারের মহতি উদ্যোগের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে কোটি-কোটি টাকা ব্যয়ে। কিন্তু সরাসরি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নজরদারির অভাবে সাব-ঠিকাদাররা ব্লক তৈরিতে নানা অনিয়ম করছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদী সুফল থেকে বঞ্চিত হবার আশঙ্কা এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজেস্ব টাস্কফোর্স দ্বারা তৈরিকৃত ব্লক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় বলেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো শতভাগ কাজের মান নিশ্চিত করছে ।টাস্কফোর্সের কাছে ধরা পড়লে সেই ব্লকগুলো বাতিল করা হয়। ফলে এখন আর প্রতিষ্ঠানগুলো অনিয়ম করতে পারে না। এছাড়াও আমাদের কর্মকর্তারা ব্লক তৈরির কাজে তদারকি করছে।আরএআর/এমএস