দেশজুড়ে

শরীয়তপুরে কমছে ধানের জমি

ধান চাষে লোকসান হওয়ায় কৃষি জমিতে তৈরি হচ্ছে মাছের খামার। ধান চাষ করতে অতিরিক্ত খরচ করে সে অনুসারে উৎপাদন না হওয়ায় কৃষকরা এখন উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন ফসলি জমিতে পুকুর কেটে মাছ চাষে। শরীয়তপুরে মাছের খামার করার কারণে গত আড়াই বছরে ধানের জমি কমেছে ৭ হাজার একরের বেশি। ফলে মোট লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে পড়ছে জেলার খাদ্য উৎপাদন। ফসলি জমি রক্ষায় কোনো সুস্পষ্ট বিধান না থাকায় অবাধে বিনাশ করা থেকে জমি বাঁচাতে পারছে না প্রশাসন। আর এ কাজে জেলা মৎস্য বিভাগও উৎসাহ দিচ্ছে মাছ চাষিদের। শরীয়তপুর কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ২০১৪ সালে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৫০ একর জমিতে ধানের চাষ হয়েছে। ২০১৫ সালে তা কমে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫৮৭ একরে নেমে এসেছে। ২০১৬ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩২৫ একরে। উৎপাদন কমেছে ৪১ হাজার ৩৯১ মেট্রিক টন ধান। এই কারণে জেলার খাদ্য উৎপাদনও লোপ পাচ্ছে প্রতিনিয়িত।বর্তমানে জেলায় খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১ লক্ষ ৭০ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে ১ লক্ষ ৫৩ হাজার মে.টন চাল এবং মাত্র ১৭ মে.টন গম। মাছ চাষের জন্য যে পরিমাণ ফসলি জমি ব্যবহার হচ্ছে যদি জমি রক্ষা করা না যায় তাহলে অচিরেই জেলার খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলার প্রধান কৃষি কর্মকর্তা।সরেজমিনে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার ছয় উপজেলাতেই ফসলি জমিকে পাল­া দিয়ে রূপান্তরিত করা হচ্ছে বড় বড় পুকুর-দীঘিতে। এসব পরিচালনা করছেন স্থানীয় টাকাওয়ালারা। তবে জাজিরা উপজেলায় এর পরিমাণ তুলনামূলক খুবই কম। নড়িয়া উপজেলার বিঝারি ইউনিয়নের মান্ডা গ্রামের লোকমান হোসেন, সজীব খানসহ ১১ জন মিলে অন্তত ১১০ বিঘা জমি নিয়ে একটি বিরাট দিঘি কেটে সেখানে মাছের খামার করছেন। যে জমিতে চলতি মৌসুমেও বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছিল। গত ৬-৮ বছর যাবৎ ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষাবাদ করে লোকসান হওয়ায় কৃষক আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন ফসল উৎপাদনে। অধিক লাভের আশায় মাছ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন তারা।জেলার ইসলামপুর, ভোজেশ্বর, ফতেহজঙ্গপুর, কনেশ্বর, ডোমসার, ডিঙ্গামানিক এলাকার জমির মালিক দ্বীন মোহাম্মদ দুলাল মাদবর, আবুল হোসেন মোল্যা, লোকমান হোসেন, সজীব খান, মজিবুর রহমান, সামছুল হক মুন্সি, আব্দুল হান্নান, চপল মোল্যা জানান, আমাদের বংশ পরম্পরায় এই সকল জমিতে ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফসল আবাদ করা হতো। গত কয়েক বছর ধান চাষে লোকসান হওয়ার কারণেই আমরা ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। তাই ফসলি জমিতে দিঘি কেটে মাছের প্রজেক্ট করছি। এতে কয়েকগুন বেশি লাভবান হচ্ছি।জেলার কৃষক সোনাবালী বেপারী, হাচান বেপারী, মারফত আলী ও হাতেম বেপারী জানান, ধানের দাম কম থাকায় অনেক জমির মালিক এক ফসলি জমি মৎস্য খামারিদের কাছে ভাড়া দেন। মৎস্য খামারিরা একসঙ্গে ১৫ থেকে ২০ একর জমি নিয়ে একেকটি মৎস্য খামার তৈরি করেন। সেখানে অনেক ক্ষুদ্র কৃষকের জমিও থাকে। ওই কৃষকদের তখন বাধ্য হয়ে খামারিদের কাছে ধান উৎপাদনের জমি ছেড়ে দিতে হয়। কৃষকেরা প্রতি শতাংশ জমি বছরে ভাড়া পান ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।জেলা মৎস্য খামার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চন্দন ব্যানার্জি বলেন, দুই বছরে শরীয়তপুরের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১১ হাজার একর জমি কেটে মাছের প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। এক ফসলি জমিতে কৃষক শুধু ধানের আবাদ করেন। ধানের বাজারমূল্য কম থাকার কারণে উৎপাদন খরচ আসে না। তাই কৃষকেরা মাছের খামার মালিকদের কাছে জমি ভাড়া দিচ্ছেন।শরীয়তপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুস সালাম বলেন, ফসল উৎপাদন থেকে মাছ চাষে অধিক মুনাফা পাওয়ায় শরীয়তপুরের কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে মাছ চাষ করছেন। এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করে মানুষ যে মুনাফা পায় তার থেকে ৪ গুন বেশি লাভবান হয় মাছচাষ করে। তাই শরীয়তপুরের মানুষ নতুন নতুন পুকুর খনন করে মাছ চাষকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এটা কৃষির সঙ্গে কোনো বিরোধ নয়, মাছ চাষ কৃষিরই একটি অংশ। আমি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি, মৎস্য চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদানের জন্য।শরীয়তপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. কবির হোসেন বলেন, কৃষি জমি সুরক্ষায় কোনাে আইন না থাকায়, ফসলি জমিতে অবাধে মাছ চাষ করে কৃষি জমি কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। এভাবে আবাদি জমি হ্রাস পেতে থাকলে জেলার  খাদ্য উৎপাদন কমে গিয়ে অচিরেই শরীয়তপুরের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।শরীয়তপুর জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, কৃষিজমি রক্ষায় সুনির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় মৎস্য চাষকে বাধাগ্রস্ত করার কোনো সুযোগ নেই।ছগির হোসেন/এফএ/পিআর