দেশজুড়ে

আলো থেকে অন্ধকারের পথে একটি পরিবার

ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। কিশোরগঞ্জ শহরের আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের দ্বিতীয় তলায় তার সিট পড়েছে। নিচে কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষা করছেন মা। এটি আমাদের দেশের খুবই সাধারণ দৃশ্য। এমনটি হয়েই থাকে। তবে কিশোরগঞ্জের এসএসসি পরীক্ষার্থী খায়রুলের গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। বৃহস্পতিবার ছিল ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। দুপুর ১টায় পরীক্ষা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর খায়রুলকে কোলে করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল আরেক পরীক্ষার্থী রবিন। রবিন তার মামাতো ভাই। নিচে একটি অটোরিকসা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন খায়রুলের মা নূর জাহান। দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন বাবা আব্দুল কাদির। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলেও নিজেদের ভাগ্য বদলাতে পারেননি প্রতিবন্ধী খায়রুল ইসলাম। বাবার মৃত্যুর পরই হঠাৎ করে দু:স্বপ্ন হানা দেয় তার জীবনে। পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে বাম হাত ও বাম পা বাঁকা হয়ে যায়। কর্মক্ষমতা হারায় হাত-পা। কিন্তু অদম্য ইচ্ছা ও প্রবল মানসিক দৃঢ়তায় লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকে খায়রুল। মামাতো ভাই রবিনের সহযোগিতায় এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও হঠাৎ করেই যেনো দু:স্বপ্ন নেমে আসে তার জীবনে। পরীক্ষা হলেই জানতে পারে তার  মুক্তিযোদ্ধা বাবার নাম বাদ পড়েছে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে।কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার চৌদ্দশত ইউনিয়নের নান্দলা গ্রামের মৃত আব্দুল কাদিরের ছেলে খায়রুল ইসলাম। বারো বছর আগে মারা যান মুক্তিযোদ্ধা বাবা আব্দুল কাদির। বাবার মৃত্যুর কিছুদিন পরই পঙ্গু হয়ে যায় খায়রুল। তবু চালিয়ে যেতে থাকে লেখাপড়া। এভাবেই এবার সে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে আসে দু:সংবাদটি। বাবার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দিয়েই চলতো দরিদ্র এ পরিবারটির ভরন-পোষণ আর খায়রুলের লেখাপড়া। কিন্তু এবার প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদিরের নাম। এ সংবাদে যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে খায়রুল আর তার মা নূরজাহানের মাথায়। পঙ্গু ছেলের পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় যাচাই-বাছাইয়ের তারিখ জানতেন না তিনি। আর তাই কমিটির সামনে হাজির হতে না পারায় তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা স্বামীর নাম।নূরজাহান এ প্রতিবেদককে বলেন, আমার স্বামী সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে চাকুরিরত অবস্থায় ২নং সেক্টরে প্রত্যক্ষযুদ্ধে অংশ নেন। সরকারি গ্যাজেটে তার নাম আছে। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনীর সনদপত্রও আছে। গত ২১ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ সদরে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা যাচাই-বাছাই করা হয়। আমি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদনও করি। কিন্তু ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় যাচাই-বাছাইয়ের তারিখটি জানতামনা। কিন্তু আমাকে না জানিয়ে এবং অনুপস্থিত দেখিয়ে আমার আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।তিনি বলেন, স্বামী দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। তার মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকায় সংসার, পঙ্গু ছেলের চিকিৎসা আর লেখাপড়া চলতো। এখন আমি প্রতিবন্ধী  সন্তানকে নিয়ে কোথায় যাবো।এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে কিশোরগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. আসাদ উল্লাহ বলেন, বিষয়টি দু:খ্যজনক। তিনি বলেন এ ক্ষেত্রে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের আপিল করতে হবে।প্রতিবন্ধী খায়রুলের মা নূরজাহান জাহান জানান, এ ব্যাপারে গত ৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করা হয়েছে।কথা হলে প্রতিবন্ধী খায়রুল ইসলাম জানায়, বাবার ভাতার টাকায় আমাদের সংসার চলে। টাকার অভাবে একটি হুইল চেয়ার কিনতে পারছিনা। মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের কোটায় কিছুদিন আগে আমার একমাত্র ছোট ভাইয়ের সৈনিক পদে সেনাবাহিনীতে চাকরি হয়েছে। এখন বাবার নাম তালিকা থেকে বাদ পড়লে আমাদের কি হবে? ভালোভাবে এ পর্যন্ত পরীক্ষা দিলেও বাবার দু:সংবাদ আমার কাছে দু:স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।এ ব্যাপারে সরকারের ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতা চান প্রতিবন্ধী খায়রুল ও তার মা।  নূর মোহাম্মদ/এমএএস/পিআর