‘১৪ ফেব্রুয়ারি’ সময় তখন সকাল ৯টা ২৫মিনিটি। ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের প্রধান ফটকে একদল কিশোর-কিশোরীর জটলা। সংখ্যায় ৩০ জনের বহর। গায়ে সবার স্কুল ইউনিফর্ম। কারো হাতে ফুল কারো হাতে ফলমূলের ঝুড়ি। রোগীরা কেউ ঘুমে। কেউবা জেগে আছে। এরই মাঝে ভালোবাসা দিবসে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে ঠাকুরগাঁও পুলিশ লাইন হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এই দলটি ঢুকে পড়ে হাসপাতালের ভেতর। কর্তৃপক্ষের অনুমতি শেষে হাসপাতালের করিডোর, ওয়ার্ড, একতলা, দোতলায় শুরু হলো অভিযান। রোগীদের কাছে গিয়ে বেশ স্মার্ট ভঙ্গিমায় উপস্থাপন “আমরা ভালোবাসা দিবসে আপনাদের ভালোবাসা জানাতে এসেছি”। এরই ফাঁকে হিমেল, অন্ত, মিতি, মনি, আসফিয়ারা কারো হাতে ফুল, কারো হাতে আপেল, কারো হাতে কমলা তুলে দিচ্ছিল। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য।ইতোমধ্যেই সিভিল সার্জনের কানে পৌঁছে গেছে ‘অপারেশন ভ্যালেন্সটাইন ডে’র কথা। রোগীদের একজন শমশের আলী (৬০) সদর থানার কহরপাড়া এলাকার বাসিন্দা। হাসপাতালে বয়সজনিত রোগে কাহিল হয়ে কদিন ধরেই ভর্তি আছেন, হাতে ফুল আর ফলমুল পেয়ে কেঁদেই ফেললেন। চোখ মুছতে মুছতে বললেন, তোমহেরা (তোমরা) এই বয়সেই এতো ভালো কাজ করছেন, হামার (আমার) বুকটা ভরে গেইল (গেল) বাবা। সালন্দর চৌধুরী হাটের বাসিন্দা রশিদা খাতুন। গাইনি সমস্যায় ভুগছেন। তিনিও ফুল আর ফলমূল পেয়ে ভীষণ খুশি। একটু লজ্জিত হয়েই বললেন, হামেরা গরিব মানুষ। ভালোবাসা টালোবাসা বুঝি না বাবা। ছোয়াগুলার (ছেলেদের) তানে মন খুলে দোয়া কচ্ছ (করছি)। ইতোমধ্যে সিভিল সার্জন ড. আবু মো. খয়রুল কবির ব্যস্ততার ফাঁকেই ডেকে পাঠিয়েছেন দলটিকে। কিশোর-কিশোরী ছেলে-মেয়েদের মাঝে তখন এভারেস্ট জয়ের আনন্দ। তার অফিসে যেতেই সিভিল সার্জন ওদের বুকে জড়িয়ে ধরেন। পিঠ চাপড়িয়ে উৎসাহ দেন। পাশাপাশি বলেন, তোমাদের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তোমরা এভাবেই মানবতার পাশে থেকো।পাশাপাশি মাদক, যৌতুক ও জঙ্গিবাদ দমনে কাজ করবে। ছেলে-মেয়েদের একার পক্ষে হঠাৎ এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তাই এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের মুখে একজন মুখ খুললো। বেরিয়ে এলো নেপথ্যের মানুষটির কথা। হিমেল বললো, এটা আমাদের বাংলা শিক্ষক নুরুজ্জামান শাহ্ স্যারের পরিকল্পনা ছিল। মিতি ও অন্তু বললো আমরা স্যারের পরামর্শ মতো এই কাজ করতে পেরে নিজেদের গর্বিত মনে করছি। ভালোবাসার দিনে ঠাকুরগাঁওয়ে মুহূর্তেই টক অব দ্যা টাউন হয়ে যায় খবরটা। ততক্ষণে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের অনেকের কাছেও পৌঁছে যায় শিক্ষার্থীদের এই অভিনব উদ্যোগের কথা। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছে এর বেশি তথ্য জানার উপায় ছিল না। ঘড়ির কাঁটা ১০টা ছুঁই ছুঁই। সবাই ততক্ষণে স্কুলের পথে রওনা দিয়েছে।এ নিয়ে কথা হয় একজন অভিভাবকের সঙ্গে। মুসলিম নগরীর রাহানা বেগম বলেন, আমার মেয়েদের কাছে এই পরিকল্পনার কথা শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি। এভাবেই ওরা অসহায় মানুষকে ভালোবাসতে শিখবে। রবিউল এহসান রিপন/এআরএ/জেআইএম