কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায় রমনা মডেল ইউনিয়নের পাত্রখাতা গ্রামে বাল্যবিয়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এই গ্রামের শতকরা ৭০ ভাগ মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার। স্কুলপড়ুয়া ৫ম থেকে দশম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় এই গ্রামের মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে। প্রতিমাসে তিন থেকে চারজন মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হয়। এসব বিয়ে প্রতিরোধে কোনো কার্যকরী উদ্যোগ না থাকায় দিন দিন বাল্যবিবাহ বেড়েই চলেছে।সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পাশে গড়ে ওঠা চিলমারী উপজেলা। পাত্রখাতা গ্রামটি উপজেলার একদম প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। ফলে এখানকার মানুষদের দুর্ভোগও সীমাহীন। আয়তনেও খুব বেশি বড় না হলেও ৯টি পাড়া-মহল্লায় বিভক্ত এই গ্রাম। এখানে প্রায় পাঁচ হাজার লোক বসবাস করেন। ভোটার সংখ্যা তিন হাজারের মতো। অধিকাংশ মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে বাস করেন। শিক্ষার হারও তেমন উল্লেখ করার মতো নয়। মেয়েদের বয়স ১০ থেকে ১২ বছর হলেই অভিভাবকরা তাদের বিয়ের দেয়ার প্রস্তুতি নেন। গেল বছর পাত্রখাতা গ্রামটিতে প্রায় ৫০ জন মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ২৫ জনই গ্রামের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাত্রখাতা রিয়াজুল জান্নাহ দাখিল মাদ্রাসার ছাত্রী।অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছেন জাফর আলীর মেয়ে ৫ম শ্রেণির ছাত্রী নূর হাওয়া, আবুল কাশেমের মেয়ে ৫ম শ্রেণির কাকলী, রবিউল ইসলামের মেয়ে ১০ম শ্রেণির রুমি খাতুন, শাহ জামালের মেয়ে ৮ম শ্রেণির শিরিনা খাতুন, মারফত আলীর মেয়ে ৯ম শ্রেণির মাজেদা খাতুন, চাঁন মিয়ার মেয়ে ৯ম শ্রেণির বিউটি, খাইরুল ইসলামের মেয়ে ৯ম শ্রেণির সামলা খাতুন, রফিকুল ইসলামের মেয়ে ১০ম শ্রেণির রোকছানা খাতুন, হাবিবুর রহমানের মেয়ে ১০ম শ্রেণির পারুল আকতার, ইসমাইল হোসেনের মেয়ে ১০ম শ্রেণির রানুকা খাতুন, নজরুল ইসলামের মেয়ে ১০ম শ্রেণির ছাত্রী লাবণীসহ আরও অনেকে মেয়ে এই মাদ্রাসার ছাত্রী। এসব ছাত্রীসহ প্রায় ২৫ জন ছাত্রী বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন।গ্রামের বাসিন্দা কৃষক আফজাল বলেন, এই গ্রামের মেয়েদের এমন বয়সেই বিয়ে হয়। বেশি বয়স হলে মেয়েদের নিয়ে নানান কথাবার্তা আর অপবাদ ছড়িয়ে পড়ার আগেই ভয়ে তাই বাধ্য হয়ে বয়স না হতেই বিয়ে দেয়া হয়।গ্রামের বাসিন্দা দিন মজুর শমসের আরী জানান, এখানে মানুষ বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে সচেতন নয়। সরকারিভাবে এটি নিষিদ্ধ হলেও পাত্রখাতা গ্রামে সামাজিকভাবে এই প্রথা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। বাল্যবিয়ের জন্য তিনি বিয়ে রেজিস্ট্রার (কাজী) ও স্থানীয় মৌলভীদের দায়ী করেন।নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, অভিভাবকরা তাদের মেয়েদের বিয়ে দেন আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে। এছাড়াও অনেক অভিভাবক মেয়েকে বাল্যবিয়ে দিতে গিয়ে জন্মসনদ স্ক্যান করে বয়স বাড়িয়ে দেয়। আবার অনুষ্ঠান না করে শুধু মসজিদের ঈমাম ডেকেই কবুল-কলেমা পড়েই বিয়ে দিচ্ছে। যাদের বাল্যবিয়ে হয় সেই মেয়েরা বিয়ের পরেও বছরের পর বছর বাবার বাড়িতেই থাকেই। ফলে এতে করে আরও সংসারে বাড়ে বাড়তি চাপ।আবিদা (ছদ্দনাম) মাদ্রাসার ৯ম শ্রেণির ছাত্রী চার বছর আগেই বেকার এক ছেলের সঙ্গে বাবা-মা জোর করে তাকে বিয়ে দেন। ৮০ হাজার টাকা যৌতুক আর একটি সাইকেল দেন। কিন্তু ছেলেটির জুয়া আর নেশাগ্রস্ত থাকায় প্রায় সময় শারীরিকভাবে নির্যাতন করতো। ফলে গত বছর তালাক নিয়ে আবার পড়াশুনা শুরু করে। ভবিষ্যতে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। কিন্তু বাল্যবিয়ের ক্ষত মন থেকে কেটে না যাওয়ায় প্রায় সময় সবার অগোচরে চোখের পানি ফেলে আবিদা।আবিদার মতো জান্নাতুন ৭ম শ্রেণির ছাত্রী। চার বোনসহ ছয় জনের সংসার। বাবা একজন কৃষক হওয়ায় অভাব তাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। ডিসেম্বর মাসে বিয়ে হয়েছে। মাঝে মধ্যেই স্বামীর বাড়ি যায় সে। কয়েকদিন থাকার পর আবার বাপের বাড়ি ফিরে আসে। এভাবেই চলছে তাদের সংসার।মাদ্রাসার ৯ম ও ১০ম শ্রেণির ছাত্রী সাথী ও মিম বলেন, আমাদের গ্রামের উচ্চশিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। উচ্চশিক্ষার জন্য মেয়েদেরকে প্রায় ৫ হতে ৬ কি.মি পথ পাড়ি দিতে হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব ভালো নয়। পথেঘাটে বখাটেদের উৎপাতের জন্য মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবেই পরিবার থেকে বয়স না হতেই বিয়ে দেয়। এমন ঘটনা ঘটেই চলেছে আমাদের গ্রামে।পাত্রখাতা রিয়াজুল জান্নাহ দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাও. আ. আজিজ আকন্দ প্রতিষ্ঠানের ২৫ জন মেয়ের বাল্যবিয়ের কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, মেয়ে ও ছেলের পরিবার গোপনীয়তা রক্ষা করে বিয়ে দেয়। আমরা এ ব্যাপারে জানতেই পারি না। তা জানতে পারলে এলাকার সচেতন মহল, মেম্বার ও প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রতিরোধ করা হয়।রমনা মডেল ইউনিয়নের বিয়ে রেজিস্ট্রার (কাজী) আব্দুল গফুর জানান, কোনো বাল্যবিয়ে আমি রেজিস্ট্রি করি না। অভিভাবকারা রেজিস্ট্রি না করে স্থানীয় মৌলভী দ্বারা বিয়ে পড়িয়ে নেন। তাছাড়া অভিভাবকরা মিথ্যে জন্ম নিবন্ধনের সনদ দিয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি করে থাকেন।এসব ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে এলাকার ইউপি সদস্য আ. আজিজ সরকার বলেন, আমি নির্বাচিত হবার পর বাল্যবিয়ে রোধে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু আমোদের গ্রামের সঙ্গে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা হওয়ায় সেখানে গিয়ে অনেকেই বিয়ে পড়ান।রমনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজগর আলী সরকার বলেন, ইতোমধ্যে পরিষদের মাসিক সভায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ইউনিয়নজুড়ে মাইকিং করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাল্যবিবাহের জন্য বিয়ের রেজিস্ট্রার, ছেলে ও মেয়ের অভিভাবকরা দায়ী।চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মির্জা মুরাদ হাসান বেগ বাল্যবিয়ের কথা স্বীকার করে জানান, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা এই জেলার সীমান্ত কাছাকাছি হবার কারণে বাল্যবিয়ে রোধে গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন শতভাগ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আশা করছি অপর উপজেলার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারের উন্নয়নে যেন বাল্যবিয়ে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে সে বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হব।বিএ