দেশজুড়ে

আড়াই মাসে বিএসএফের হাতে নিহত ৬, আহত ৯

বার বার পতাকা বৈঠক ও সীমান্ত সম্মেলন হলেও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা গুম ও নির্যাতনের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনের পর থেকেই মারমুখী অবস্থানে রয়েছে ভারতীয় বিএসএফ। ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আড়াই মাসে বেনাপোল সীমান্তে বিএসএফের হাতে ছয় জন বাংলাদেশি নিহত ও নয় জন নির্যাতনে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতাল ও বাড়িতে শয্যাশায়ী রয়েছেন।সীমান্তের ওপারের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ গরু পাচার বন্ধে ১ এপ্রিল গরু পাচারের প্রধান রুট বেনাপোলের পুটখালি সীমান্তের বিপরীতে ভারতের আংরাইল বিএসএফ ক্যাম্প ও সীমান্তবর্তী ইছামতি নদী এলাকা পরিদর্শন করেন। গরু পাচার রুখতে ও অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করার নির্দেশ দেন বিএসএফকে। রাজনাথ বলেন, `পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সহযোগিতা নিয়ে সীমান্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।` প্রয়োজন হলে গরু পাচার রুখতে গুলি চালানোরও নির্দেশ দেন তিনি। এর পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ টহলবৃদ্ধিসহ আগ্রাসি মনোভাব নিয়ে সীমান্ত রক্ষার কাজ শুরু করেছে। সীমান্ত সূত্রে জানা গেছে, ১ ফেব্রুয়ারি বেনাপোলের পুটখালী সীমান্তের বিপরীতে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে বাংলাদেশি গরু ব্যবসায়ী আলিম খন্দকারকে (৩০)। তিনি গোপালগঞ্জ জেলার ইউসুফ মিয়ার ছেলে। ১৯ ফেব্রুয়ারি নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার আলিম মোল্লার ছেলে শরিফুল ইসলামকে (৩৫) গুলি কারে হত্যা করে বিএসএফ। ২১শে ফেব্রুয়ারি অভয়নগর উপজেলার আমজাদ হোসেনের ছেলে গোলাম রসুলকে (৩৫) পিটিয়ে হত্যা করে লাশ বাংলাদেশ সীমান্তে ভাসিয়ে দেয়া হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি পুটখালী সীমান্তের ১৭/৭, ১৬৪ আর পিলারের কাছ থেকে মাত্র ২০০ গজ ভারত সীমান্তের অভ্যন্তরে এক অজ্ঞাত তরুণীকে নির্যাতনের পর হত্যা করেছে বিএসএফ। পরে বনগাঁও থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। সর্বশেষ ১১ এপ্রিল বেনাপোলের দৌলতপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতীয় কালিয়ানি বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা গুলি চালালে গরু নিয়ে ফেরার সময় পুটখালি গ্রামের আজিজুল ইসলামের ছেলে আকু (৩১) ও আব্দুস সাত্তারের ছেলে মনির হোসেন শান্ত (৩৫) নামে দুই  বাংলাদেশি গরু ব্যবসায়ী নিহত হন। এ ছাড়া ২ ফেব্রুয়ারি বেনাপোলের বারোপোতা গ্রামের চাঁন মিয়ার ছেলে আজিজুর রহমানকে (২২) পিটিয়ে আহত করা হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের বনগাঁও থানার জয়দেব পালের ছেলে জয়ন্ত পালকে বাংলাদেশি ভেবে পিটিয়ে ও ইছামতি নদীতে স্পিড বোর্ডের পাখা দিয়ে আঘাত করে বাংলাদেশ সীমারেখায় ফেলে দেয়া হয়। পরে বিজিবি তাকে উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। এখনও তিনি চিকিৎসাধীন। ১৬ ফেব্রুয়ারি বেনাপোল পোর্ট থানার গয়ড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে শরিফুলকে (২৬) কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করে বিএসএফ। ১৯ ফেব্রুয়ারি বেনাপোল পোর্ট থানার শিবনাথপুর গ্রামের গোলাম হোসেনের ছেলে আবির হোসেনকে (২৪) কুপিয়ে আহত করা হয়। ২ মার্চ বিএসএফ সদস্যরা স্পিডবোটের নিচে ফেলে শার্শার উপজেলার কন্যাদহ গ্রামের মোসলেম আলীর ছেলে সেলিম হোসেন (২৫) নামে এক রাখালকে মারাত্মকভাবে জখম করে। ৩ মার্চ বিকেলে পুটখালী সীমান্তের ইছামতি নদীর তীর থেকে বিএসএফ পুটখালী গ্রামের রেজাউল হোসেনের ছেলে আব্দুল্লাহ (২০) ও  খুলনার খানজাহান আলী থানার মুশিয়ানি গ্রামের আফজাল হোসেনের ছেলে রুবেলকে (২২) ধরে নিয়ে ক্যাম্পে অমানুষিক নির্যাতন করে থানায় সোপর্দ করে।  বিজিবি`র সাথে পতাকা বৈঠক হলেও তাদের ফেরত দেয়নি বিএসএফ। ১৩ মার্চ বিএসএফ ইছামতি নদীর তীর থেকে বিএসএফ গরুর রাখাল বেনাপোল পোর্ট থানার গয়ড়া গ্রামের রমজান আলীর ছেলে রফিকুল ইসলামকে (২৫) ধরে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে গুরুতর জখম করে মৃত ভেবে নদীর ধারে ফেলে রেখে যায়। বিজিবি সদস্যরা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে যশোর হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। ৪ এপ্রিল বিএসএফ সদস্যরা স্পিডবোটের নিচে ফেলে বেনাপোলের কাগজপুকুর এলাকার শোয়েব আলীর ছেলে সবুজ হোসেন (১৯) নামে এক রাখালকে মারাত্মকভাবে জখম করে। স্পিডবোটের আঘাতে সবুজের ডান পা ভেঙে গেছে। বাম পা এবং নিতম্বের আঘাতও গুরুতর।এ ব্যাপারে মানবাধিকার সংস্থা রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, সীমান্তে বার বার বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক হলেও কিছু হচ্ছে না। বরং হত্যা নির্যাতন গুমের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিএসএফ বাংলাদেশিদের দেখলে বাঘের মত আক্রমণ করে বসে। তাদের আক্রমণে কেউ নিহত হন কেউ সারাজীবন পঙ্গু হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েন। বিজিবিকেও এ ব্যাপারে কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে। পুটখালী বিজিবি`র কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার শফিউদ্দিন হাওলাদার  জাগো নিউজকে বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। বার বার এ ব্যাপারে বিএসএফের সাথে বৈঠক হলেও তারা সব কিছু উপেক্ষা করে ইচ্ছা অনুযায়ী এসব কাজ করে যাচ্ছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করার পরও সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছে না।’ তবে সীমান্তের প্রতিটি ঘটনায় আমরা প্রতিবাদ জানিয়ে আসছি।এমজেড/পিআর