দেশজুড়ে

করতোয়ার ঐতিহ্য আছে, প্রাণ নেই

প্রায় তিন হাজার বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে পুন্ড্রবর্ধন নামের একটি রাজ্য ছিল। ওই রাজ্যের রাজধানী ছিল মহাস্থানগড়। ওই রাজধানীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর নাম করতোয়া। মহাভারতেও করতোয়া নদীর উল্লেখ আছে। এ থেকে করতোয়া নদীর প্রাচীনত্ব সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু ওই করতোয়া এখন মরে গেছে। একে খাল ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। ওই খালটিও এখন মৃতপ্রায়।

জানা গেছে, বগুড়া শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদী দেখলে বোঝার উপায় নেই এককালে এটি ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। চলত নৌকা ও স্টিমার। দীর্ঘদিনে মরে যাওয়া নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে এক যুগ আগে প্রকল্প নেয়া হয়। নানা জটিলতার কারণে সেটি বাস্তবায়ণ হয়নি। এ কারণে করতোয়া এখন দখলদারদের অন্যতম লক্ষ্য। নদীর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে ব্যক্তি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত শিল্প, আবাসিক ভবন, হাসপাতাল ও মার্কেট। দখলপ্রবণতা অব্যাহত থাকায় নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগ থেকে জানা যায়, প্রমত্তা করতোয়ার নাব্যতা হ্রাস করা হয় ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে। সে সময় গোবিন্দগঞ্জে কাটাখালীর কাছে বহমান করতোয়ার স্রোতে বাধা দিয়ে তা বাঙালি নদীতে পাঠানো হয়। একই সময় গোবিন্দগঞ্জে চকরহিমপুরে একটি রেগুলেটর নির্মাণের মাধ্যমে প্রবাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। এ কারণে খরস্রোতা নদী কালক্রমে হয়ে উঠেছে একটি খাল।

পানি না থাকায় গোবিন্দগঞ্জ থেকে শুরু করে বগুড়া পর্যন্ত এই নদীর বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়েছে দখল প্রক্রিয়া। নদীর বুকে পানি না থাকায় সেটা পরিণত হয় শস্যখেতে। বর্তমানে করতোয়া নদীর কোনো কোনো স্থানে দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে ভবন। বর্ষা মৌসুমে কিছু পানি থাকলেও বছরের বেশির ভাগ সময় করতোয়া থাকে শুকনো। কোনো কোনো স্থানে পৌর এলাকার আবর্জনা ফেলা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকেই করতোয়া নদীর জায়গা দখল শুরু হয়। করতোয়া নদীকে দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে ডায়াবেটিক হাসপাতাল। বেসরকারি সংস্থা ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘের (টিএমএসএস) সুবিশাল ভবন নির্মিত হয়েছে করতোয়া দখল করে। এ ছাড়া সিনেমা হল, বাড়ি, কারখানা, গোডাউন নির্মাণ করা হয়েছে। এসপি ব্রিজ এলাকায় নদীর মধ্যে সীমানা প্রাচীর দিয়ে জায়গা দখল করেছেন একজন চিকিৎসক। মালতিনগর চাঁনমারি ঘাট এলাকায় নদী দখল করে আছে শহরের মাটি ও বালু ব্যবসায়ীরা। ফতেহ আলী সেতু এলাকায় দখল করে এক ব্যবসায়ী গড়ে তুলেছেন বিশাল গুদাম, বাড়ি, ময়দার মিল ও কারখানা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালে করতোয়া নদী উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিচু এলাকাকে বন্যা থেকে রক্ষা করা। এ ছাড়া নদীর দুই তীর বাঁধাই করার মাধ্যমে জলপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা ও শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। পাউবো, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পৌরসভা যৌথভাবে এ প্রকল্প হাতে নেয়। এ জন্য ১২৫ কোটি টাকার একটি খসড়া প্রকল্প (পিপি) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে আর সেটি আলোর মুখ দেখেনি।

প্রকল্পে উল্লেখ ছিল, নদী খননের মাধ্যমে তলদেশ করা হবে ৫০ ফুট চওড়া, উপরাংশ হবে ১৫০ ফুট এবং নদীর গভীরতা হবে ২৫ ফুট। নদীর তীরে বাঁধের ওপরের রাস্তার দৈর্ঘ্য হবে ১৪ ফুট প্রশস্ত। বেতগাড়ি থেকে মাটিডালি পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে পাঁচটি সেতুও পাঁচটি পার্ক তৈরি হবে। রাস্তার মধ্যে সোডিয়াম লাইট ও বৃক্ষরোপণ করা হবে।

বগুড়ার পৌর মেয়র অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান জানান, বগুড়াকে মডেল টাউনে রূপন্তরের উদ্দেশে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। প্রকল্পের অধীনে শহরের দক্ষিণাংশ বর্তমান মাঝিড়া থানার বেতগাড়ি থেকে উত্তরাংশের মাটিডালি পর্যন্ত নদীর দুই তীর সংরক্ষণের জন্য বাঁধ নির্মাণ। এর ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হবে। নদীর উভয় তীরে সাড়ে ১৩ কিলোমিটার করে ২৭ কিলোমিটার বাঁধের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হলেও একদিকে বাঁধের কারণে যেমন নিম্নাঞ্চল বন্যামুক্ত হবে তেমনি রাস্তাটি জনসাধারণ ব্যবহার করলে শহরের যানজট অনেকটা লাঘব হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০২ থেকে আজ পর্যন্ত প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়নি। পরিবেশবিদ মনিরুজ্জামান খান আপেল বলেন, শুধু নদী তীরে বাঁধ নির্মাণ করে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করলে করতোয়া প্রাণ ফিরে পাবে না। এখানে প্রাণ সঞ্চার করতে হলে প্রয়োজন পানি প্রবাহের।

পাউবো বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আমিন বলেন, ওই প্রকল্প আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বগুড়ার জেলা প্রশাসক শফিকুর রেজা বিশ্বাস বলেন, সর্বশেষ অবৈধ দখলদারদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। রাজস্ব বিভাগ সেটি যাচাই-বাছাই করছে।

আরএআর/আরআইপি