অদম্য সংগ্রামী এক নারীর প্রতিকৃতি হয়ে ধরা দিলেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মহিধর এলাকার হতদরিদ্র দিনমজুর আয়নাল হকের বিধবা কন্যা দুই পুত্রসন্তানের জননী আনোয়ারা বেগম।
৩৫ বছর বয়সী হার না মানা এই সাহসী নারী জেলায় সবার কাছে পরিচিত মুখ। সবাই তাকে চেনেন নারী ‘ফেরিওয়ালা’ হিসেবে। এলাকার সবাই তাকে ‘ফেরিওয়ালা আপা’ বলেই ডাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১২-১৩ বছর বয়সে বাল্যবিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল তাকে। প্রথম স্বামীর সঙ্গে তার চার বছর সংসার জীবনে আরিফ ও কাজল নামে দুই পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। তারপর তিনি জানতে পারেন স্বামী মকবুল হোসেন খারাপ চরিত্রের মানুষ। পরে সংসার ভেঙে যায় তার।
এরপর বাবার বাড়িতে দুই সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নেন। হতদরিদ্র বাবা আয়নাল হক দিনমজুরের কাজ করেন। দুই বেলা কখনও স্ত্রী-সন্তানদের পেট পুরে খাবার জোটত না তার। এসব দেখে আনোয়ারা বেগমের মধ্যে নতুন কিছু করার স্পৃহা জাগে।
২০০৭ সালের দিকে পার্শ্ববর্তী কাপড় ব্যবসায়ী ও সাবেক ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে কিছু কাপড় নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ফেরিওয়ালা হিসেবে বেচাকেনা করেন। ধীরে ধীরে তার ব্যবস্থা সমৃদ্ধ হতে থাকে। পাশাপাশি আয় দিয়ে সংসারের হাল ধরতে শুরু করেন তিনি।
এ কাজের পাশাপাশি দুই সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করেন তিনি। পরেরটা ইতিহাস। অল্প কিছুদিনের মধ্যে শুরু হয় তার সাফল্য।
অল্প সময়ের মধ্যে তিনি সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। প্রতিনিয়ত কাকডাকা ভোরে বাইসাইকেলে পার্শ্ববর্তী রাজারহাট উপজেলা ও লালমনিরহাট সদরের বড়বাড়ী, পঞ্চগ্রাম, রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউপির ধরলা নদীর তীরবর্তী চর এলাকায় কাপড় বিক্রি করতে চষে বেড়ায়। এসব এলাকায় সবার কাছে তিনি পরিচিত।
সম্প্রতি কালুয়ার চর এলাকায় ফেরিওয়ালা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে কথা হয়। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি তার মনের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলো খোলামেলা বলতে শুরু করলেন।
তিনি বলেন, প্রতি মাসে ফেরি করে কাপড় বিক্রি করে ১৫-২০ হাজার টাকা আয় হয় তার। পরিবার-পরিজনের খরচ চালিয়ে সঞ্চয় জমা রেখে এখন তিনি ১১ শতাংশ বসতভিটার জায়গা কিনে দোতলা বাড়ির কাজ শুরু করেছেন। একই সঙ্গে কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কের পাশে আমিনবাজার নামক স্থানে দুই শতাংশ জায়গা কিনেছেন তিনি।
আনোয়ারা বেগম বলেন, বড় ছেলে আরিফ এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে এবং ছোট ছেলে কাজল সপ্তম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে।
এরই মধ্যে ছিনাই বড় গ্রাম এলাকার দুর্ধর্ষ চোর আবদুস সালামের (৪৫) সঙ্গে আনোয়ারা বেগমের বছর তিনেক আগে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। কিছুদিন পর তিনি জানতে পারেন সালাম দুর্ধর্ষ চোর। এরপর আনোয়ারা বেগম তাকে ডিভোর্স দেন। তবে এখন শুধু তার একটাই চিন্তা ছেলে দুটাকে মানুষের মতো মানুষ বানানো।
দেশে নির্যাতিতা নারীদের উদ্দেশ্যে আনোয়ারা বেগম বলেন, তারা যেন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সবকিছু সামলে নিতে পারে এবং আমার ইতিহাসটা লক্ষ্য করে নিজেদের মানিয়ে নেয়। আর সমাজে কে কী বলল, সেটা মূল বিষয় নয়। সমাজের কথায় আমার কিছু যায় আসে না। নিজে কি করতে পেরেছি, কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি সেটিই দেখার বিষয়।
এএম/জেআইএম