৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণই ছিল নিরস্ত্র বাঙালি জাতির সশস্ত্র সংগ্রামের পূর্ব সংকেত এমনটাই বললেন, ’৭১’র রণাঙ্গনের কাদেরিয়া বাহিনীর দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা ও টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক খন্দকার আশরাফউজ্জামান স্মৃতি।
তিনি বলেন, এই ভাষণের ১৮ দিন পর ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর বর্বরচিত ও রোমহর্ষক অপারেশন সার্চলাইট নামে এক অভিযান চালায় পশ্চিম পাকিস্তানি হায়েনারা।
এই অভিযানের শিকার হয় রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প, পিলখানা, ইপিআর হেডকোয়ার্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলসহ ছাত্র ছাত্রীদের সবগুলো আবাসিক হল।
কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফউজ্জামান স্মৃতি বলেন, ২৬ মার্চ টাঙ্গাইল শহরের আদালতপাড়াস্থ অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সাহেবের বাস ভবনে আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়ে টাঙ্গাইল জেলা স্বাধীন বাংলা গণমুক্তি পরিষদ গঠন করে।
এই সশস্ত্র গণমুক্তি পরিষদের সর্বাধিনায়ক হিসেবে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এদিনই গণমুক্তি পরিষদ নেতৃবৃন্দ সারাদিন চেষ্টা চালিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেন।
টাঙ্গাইলের যেসব স্থানে পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলন ছিল সেগুলো নামিয়ে বাংলাদেশের প্রথম অঙ্কিত লাল সবুজ সোনালি রঙের মানচিত্র অঙ্কিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। শুধু টাঙ্গাইল সার্কিট হাউজে পাকিস্তানি দুই পাঞ্জাবি অফিসারের নেতৃত্বে গড়া বাঙালি সেনা ঘাঁটিতেই উত্তোলন ছিল একটি পাকিস্তানি পতাকা।
হামলার পরিকল্পনা নিয়ে রাতেই ঘেরাও করা হয় সার্কিট হাউজ। তবে সেখানে অবস্থান করছিল অসংখ্য বাঙালি সৈনিকরা। এ কারণে ২৭ মার্চ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে আলোচনার মাধ্যমে বাঙালি সৈনিকদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের শপথ করিয়ে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
টাঙ্গাইল ছেড়ে যাওয়ার আগে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকরা সার্কিট হাউজে অবস্থানরত কোম্পানির কমান্ডারসহ দুই পাঞ্জাবি অফিসারকে হত্যা করে মরদেহের দায়িত্ব হাই কমান্ডের কাছে দিয়ে ময়মনসিংহ চলে যায়।
পাঞ্জাবি অফিসারদের মরদেহগুলো প্রথমে সার্কিট হাউজের পেছনে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়। অবশেষে তৎকালীন ডিসি ও এসপি সাহেবের অনুরোধে মরদেহগুলো তুলে কাগমারী ব্রিজের কাছে লৌহজং নদীর পাড়ে পুনরায় মাটিচাপা দেয়া হয়।
পরে গভীর রাতে টাঙ্গাইল বেবিস্ট্যান্ড গোরস্থানে দাফন করা হয়। হানাদার বাহিনীর গতিরোধের চেষ্টায় রাস্তার পাড়ের গাছ কেটে ফেলে রাখা হয়।
২ এপ্রিল জেলাখানায় আটক বন্দিদের মুক্তি দিয়ে এদের মধ্য থেকে বাছাই করে খানেক বন্দিকে মুক্তিবাহিনীতে নেয়া হয়। তৈরি হয় প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতিতে নাটিয়াপাড়ায় দ্বিতীয় প্রতিরক্ষার লাইন।
পাশাপাশি তৈরি করা হয় মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই থেকে নাটিয়া পাড়া পর্যন্ত টেলিফোন লাইন। ইপিআররা গোরান সাটিয়াচরায় বাঙ্কার খুঁড়ে নেয় অবস্থান। এর দুই মাইল আগে ধল্লা পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে পজিশন নেয় মুক্তিবাহিনী।
তিনি বলেন, ৩ এপ্রিল টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার গোরান সাটিয়াচরায় প্রথম সংগঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযুদ্ধ। এদিন হানদার বাহিনীর টাঙ্গাইল প্রবেশ মুখে মুক্তিযোদ্ধাদের নলের মুখে পড়ে যায়।
এ সময় রাস্তার পাশ থেকে নায়েব সুবেদার আব্দুল আজিজ তার এলএমজি থেকে প্রথম গুলি বর্ষণ করে। সঙ্গে সঙ্গে ৬টি এলএমজি আর ৫০টি রাইফেল হানাদারদের ওপর মুহুর্মুহু গুলি চালাতে থাকে। ৩টি লাঞ্চার ও ৩টি ২ ইঞ্চি মর্টার থেকেও ইপিআররা অনবরত গুলি চালাতে থাকে।
হঠাৎ আক্রান্ত হয়ে হানাদারেরা একেবারে দিশেহারা হয়ে যায়। তাদের ধারণা ছিল না এতো বড় গাড়ি বহরের ওপরে এমন আক্রমণ হতে পারে। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে হানাদারদের গাড়ি রাস্তার নিচে উল্টে পড়ে যায়। গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়া সৈনিকরা রাস্তার দুই পাশে পজিশন নিতে গেলে তাদের ওপর মুক্তিবাহিনী ও ইপিআররা পাখি শিকারের মতো তাক করে গুলি করতে থাকে।
পাকিস্তানিরা তখন পাল্টা প্রতিরোধ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। হানাদারদের ২০-২৫টি গাড়ি মুক্তিবাহিনীর সামনে এসে পড়েছিল, তা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়।
সকাল ৯টার দিকে ডিফেন্স ভেঙে যাওয়ায় কাদের সিদ্দিকী অনুরোধে মুক্তিযোদ্ধারা টাঙ্গাইল ফিরে আসে। এই অবস্থায় ধীরে ধীরে পাকিস্তানিদের আক্রমণ ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হতে থাকে। তারা ৭২-এমএমআর ও ১২০-এমএম কামান থেকে অনবরত গোলা ছুড়তে থাকে। এই অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের ডিফেন্স বেশিক্ষণ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
হানাদারদের হামলায় একের পর এক বাঙ্কার ধ্বংস হয়ে যায়। গোরান সাটিয়াচরার এই যুদ্ধে ২৪ জন ইপিআরসহ ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
এছাড়া হানাদারদের প্রায় ৩ শতাধিক নিহত ও দেড় শতাধিক আহত এবং প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ধ্বংস হয়। এদিন পাকিস্তানিরা গ্রামের মধ্যে ঢুকে নির্মমভাবে শিশু, নারী ও পুরুষকে হত্যা করে। ওদিকে বাঙালি যোদ্ধারা প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ধীরে ধীরে আরও সুসগঠিত হয়।
আরিফ উর রহমান টগর/এএম/জেআইএম